জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর ক্ষণগণনা
৫৫দিন
:
১৯ঘণ্টা
:
৪৩মিনিট
:
৩৭সেকেন্ড

রবিবার, ২২ মার্চ ২০২০, ০১:১৭ অপরাহ্ন

‘যুদ্ধ নয়, লাখ লাখ মানুষ মারা যাবে ভাইরাসে’

খবরের আলো ডেস্ক :

 

 

‘আগামী কয়েক দশকে কোনও যুদ্ধে নয়, লাখ লাখ মানুষ মারা যাবে ভয়াবহ সংক্রামক কোনো ভাইরাসের আক্রমণে। মানুষ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নয়, প্রাণ হারাবে ক্ষুদ্র জীবাণুতে।’

করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার বহু আগে এ কথা বলেছিলেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। তিনি ২০১৫ সালে টেডএক্সে এক বক্তৃতায় এই সতর্কবাণী করেছিলেন।

এর কারণ হিসাবে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমরা পারমাণবিক প্রতিরোধক তৈরিতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেছি; অথচ একটি মহামারি ঠেকানোর সিস্টেমের বেলায় সত্যিকার অর্থে আমাদের বিনিয়োগ সামান্যই। আমরা পরবর্তী মহামারির জন্য প্রস্তুত নই।’

তখন তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার দিন নেই, সময় এখন জীবাণুর সঙ্গে লড়াই করার।’

এসময় তিনি ইবোলা ভাইরাসের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘ইবোলা মোকাবেলায় আমাদের বেশ কঠিন কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। …পোলিও নির্মূল করার জন্য আমরা যে বিশ্লেষণকারী টুল ব্যবহার করি, সেই টুল দিয়েই ইবোলার বিষয়টি খুব নিবিড়ভাবে খেয়াল করেছি আমি। এবং কী দেখা গেল? যদি হতো যে আমাদের একটি সিস্টেম ছিল, তবে ঠিকঠাক কাজ করেনি, তা কিন্তু নয়। সমস্যাটি হলো, আমাদের কোনো সিস্টেমই ছিল না। আদতে ইবোলা ছড়িয়ে পড়ার ওই সময়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু কর্তব্য আমরা পালন করিনি।’

তিনি আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা মহামারি নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘আমাদের কোনো মহামারি বিশেষজ্ঞ ছিলেন না। আমাদের কোনও চিকিৎসা দলও ছিল না। ইবোলার ব্যাপারে মানুষকে প্রস্তুত করে তোলার মতো কোনো উপায় জানা ছিল না আমাদের। মেডিসিনস সানস ফ্রন্টিয়ারস (আন্তর্জাতিকভাবে চিকিৎসাদানকারী মানবতাবাদী বেসরকারি সংস্থা) স্বেচ্ছাসেবীদের সংঘবদ্ধ করার ব্যাপারে অবশ্য বেশ ভালো কাজ করেছে। তারপরও এ ক্ষেত্রে আমাদের গতি ছিল ভীষণ মন্থর, আক্রান্ত দেশগুলোতে হাজার হাজার কর্মী পাঠানোই কাম্য ছিল।’

এজন্য ওই ভাষণে তিনি বড় ধরনের মহামারি মোকাবেলায় লাখ লাখ কর্মী কর্মী তৈরির ওপর জোর দিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘ইবোলার সময় চিকিৎসার জন্য হাত বাড়ানোর মতো কেউ ছিল না। রোগ নির্ণয় করার মতো কাউকে দেখিনি আমরা। ইবোলার ক্ষেত্রে কোন জিনিসটি কাজে আসবে, তা কেউ জানতও না। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, বেঁচে থাকা মানুষের শরীর থেকে রক্ত নিতে পারতাম আমরা, সেই রক্ত থেকে প্লাজমা সংগ্রহ করে আক্রান্তদের বাঁচানো যেত। অথচ সেই চেষ্টাও করা হয়নি।’

২০১৫ সালে আফ্রিকার দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা মহামারি ১০ হাজারের মতো মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। তাই নতুন কোনও মহামারির মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছিলেন বিল গেটস।

তিনি বিশ্ববাসীকে সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘পরবর্তী সময়ে ভাগ্যদেবী আমাদের ওপর হয়তো অতটা প্রসন্ন থাকবেন না। আমরা এমন একটা ভাইরাসে হয়তো আক্রান্ত হব, যার ফলে বিমানে চড়ার সময় কিছুই টের পাব না। বাজারে যাওয়ার সময় হয়তো শরীর ঠিকঠাক থাকবে। ভাইরাসটির উৎস হতে পারে ইবোলার মতো কোনো প্রাকৃতিক মহামারি। কিংবা তা জৈব সন্ত্রাসবাদের (বায়োটেরোরিজম) কারণেও হতে পারে। অর্থাৎ দুনিয়ায় এমন অনেক কিছুই আছে, যার ফলে পরিস্থিতি আক্ষরিক অর্থেই কয়েক লাখ গুণ বেশি খারাপ হতে পারে।’

বিল গেটস কেবল সতর্ক করে দিয়েই ক্ষান্ত হননি, আগাম প্রস্তুতির বিষয়ে অনেকগুলো উপায়ও বাতলে দিয়েছিলেন, বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোর জন্য।

তিনি তখন বলেছিলেন, ‘প্রথমত, দরিদ্র দেশগুলোতে শক্তিশালী স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন। যেখানে মায়েরা নিরাপদে সন্তান জন্ম দিতে পারবেন, শিশুরা পাবে সব টিকা। আবার যেসব অঞ্চলে প্রথম দিকেই প্রাদুর্ভাব দেখা দেবে, সেখানেও এসব প্রয়োজন। আমাদের একটি বিশেষায়িত চিকিৎসক বাহিনীও লাগবে। যে বাহিনীতে যথেষ্ট পরিমাণে পেশাদার এবং প্রশিক্ষিত মানুষ থাকবে, যারা যেকোনো মুহূর্তে অভিজ্ঞতা পুঁজি করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত থাকবে সব সময়। তারপর ওই চিকিৎসক বাহিনীর সঙ্গে সেনাবাহিনীকে জুড়ে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর দ্রুত গতিময়তা, রসদ এবং নিরাপত্তার সুবিধাগুলো কাজে আসবে।’

‘আমি জানি না এসবের পেছনে কত টাকা খরচ হবে। তবে এটা নিশ্চিত, সম্ভাব্য ক্ষতির তুলনায় অঙ্কটি হবে নিতান্তই সামান্য। বিশ্বব্যাংকের অনুমান, ফ্লুজনিত কোনো মহামারি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে দুনিয়ার অর্থনীতি ধসে পড়বে। আর্থিক ক্ষতি হবে তিন ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। প্রাণ হারাবে লাখো মানুষ। যে বিনিয়োগগুলোর কথা বললাম, সেগুলো করলে কেবল মহামারির জন্য প্রস্তুতই হব না আমরা; এর বাইরে আরও উল্লেখযোগ্য কিছু সুবিধাও মিলবে। গবেষণা-উন্নয়ন এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসমস্যা হ্রাস পাবে। পৃথিবীটা হয়ে উঠবে আরও নিরাপদ।’

‘সুতরাং আমি মনে করি, এটাই আমাদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বাড়িতে স্প্যাগেটির ক্যানের ভান্ডার গড়ে তোলার দরকার নেই, প্রয়োজন নেই বেসমেন্টে ঘাপটি মারার। তবে আমাদের প্রস্তুত হতেই হবে, কারণ, সময় আমাদের পক্ষে নয়।’ সবশেষে বলেছিলেন মাইক্রেসফটের প্রতিষ্ঠান বিল গেটস।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, তার সাবধানবাণীতে কান দেননি বিশ্বের নীতি নির্ধারক দেশগুলো। যে কারণে আজ বিল গেটসের ভবিষ্যৎ বাণী পদে পদে সত্যি হয়েছে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া করোনা মহামারিতে শনিবার অব্দি ৩ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছে আরও ১৩০৫০ জন। এই মহামারি ঠেকাতে হিমসিম খাচ্ছে গোটা বিশ্ব। আজ স্থবির হয়ে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতির চাকা। বন্ধ রয়েছে এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের যোগাযোগ।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2018 Dailykhaboreralo.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com