২২শে জানুয়ারি, ২০২৬

বিজয় উদযাপনের মুসলিম রীতি

ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে দৃষ্টি ফেরালে দেখা যায় মানুষের কাছে বিজয় চিরকালই এক আবেগঘন অধ্যায়। যুদ্ধ, সংগ্রাম কিংবা দীর্ঘ সাধনার পর অর্জিত সাফল্য মানুষকে অনেক বেশি আনন্দিত করে, শিহরণ জাগানো উল্লাসে ভাসায়। কিন্তু ইসলাম বিজয়কে কেবল আবেগের বিষয় হিসেবে দেখেনি; বরং একে নৈতিকতা, আত্মসংযম ও দায়িত্ববোধের কঠিন পরীক্ষায় পরিণত করেছে। কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিজয় উদযাপনের মুসলিম রীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এ রীতি অহংকারের নয় কৃতজ্ঞতার সবক দেয়; এ রীতি প্রতিশোধের নয় ক্ষমার নির্দেশ দেয়; এ রীতি আত্মপ্রশংসার নয় আত্মশুদ্ধির তাগাদা দেয়।

মহানবী (সা.)–এর জীবন বিজয় উদযাপনের মুসলিম রীতি বা আদর্শের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত।পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নাসর নাজিল হওয়ার পর তিনি এই বিজয়োত্তর নির্দেশনাকে বাস্তব জীবনে রূপ দেন। আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, এরপর থেকে রাসুল (সা.) তাঁর রুকু ও সিজদায় অধিক পরিমাণে পড়তেন— “সুবহানাকা আল্লাহুম্মা রব্বানা ওয়া বিহামদিকা, আল্লাহুম্মাগফির লি।” (হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র, আপনার প্রশংসাসহ; হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন)। এই আমল প্রমাণ করে যে, ইসলামে বিজয়ের মুহূর্ত আত্মঅহংকারের নয়; বরং তা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা ও আত্মশুদ্ধির সময়। (সহিহ বুখারি, কিতাবুত তাফসির, হাদিস: ৪৯৬৭; সহিহ মুসলিম, কিতাবুস সালাত, হাদিস: ৪৮৪)।

ইসলামে বিজয় উদযাপনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রীতি হলো ক্ষমা ও সহনশীলতা। মক্কা বিজয়ের দিন, দীর্ঘ তেরো বছর যারা রাসুল (সা.)–কে নির্যাতন করেছে, হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে, তাদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেছিলেন: “আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। তোমরা সবাই মুক্ত।” (সিরাতে ইবন হিশাম, খণ্ড ৪, পৃ. ৫৪–৫৫; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবন কাসির, ৪/৩০০)। এই ঐতিহাসিক ঘোষণা বিজয়োত্তর প্রতিশোধের সংস্কৃতিকে চিরতরে ভেঙে দেয় এবং মানবসভ্যতাকে ক্ষমার এক অনন্য আদর্শ উপহার দেয়।

ইসলাম বিজয়কে সামাজিক দায়িত্ব পালনের সূচনাও হিসেবে দেখে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দেন আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দিতে এবং মানুষের মাঝে বিচার করলে ন্যায়বিচার করতে।” (সুরা নিসা : ৫৮)। অর্থাৎ, বিজয় অর্জনের পর শাসনক্ষমতা বা স্বাধীনতা যদি আসে, তবে তা ন্যায়, ইনসাফ ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যবহার করাই মুসলিম রীতি।

মহান বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বরের প্রেক্ষাপটে এই কোরআনিক ও নববী শিক্ষা আমাদের জন্য গভীর তাৎপর্য বহন করে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত এই বিজয় আমাদের কেবল আনন্দের অধিকারই দেয় না; বরং আমাদের ওপর ন্যস্ত করে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের দায়িত্ব। ইসলামের আলোকে বিজয় উদযাপন মানে হচ্ছে- রাষ্ট্রে প্রতি সম্মান দেখানোর পাশাপাশি স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া, শহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণ করার পাশাপাশি নিজেদের চরিত্র ও কর্মপরিকল্পনা শুদ্ধ করা।

সবশেষে বলা যায়, মুসলিম রীতিতে বিজয় কোনো উল্লাসের সমাপ্তি নয়; এটি আত্মসংযম, নৈতিক দৃঢ়তা ও আল্লাহমুখী জীবনের নতুন সূচনা। কোরআনের ভাষায়, প্রকৃত বিজয় সেই বিজয়—যা মানুষকে অহংকারে নয়, বরং বিনয় ও দায়িত্ববোধে আরও উচ্চতর করে তোলে।

মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে তাঁর শুকরিয়া আদায় করার পাশাপাশি নিজ মাতৃভূমিকে কল্যাণময় রাষ্ট্র হিসেবে গড় তুলতে ভুমিকা রাখার তাওফিক দান করুন। আমীন।

মন্তব্য করুন