শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ০৮:৩৮ অপরাহ্ন

পদ্মা সেতুর কাজ ৬০ ভাগ সম্পন্ন, প্রধানমন্ত্রী পরিদর্শনে যাবেন ১৩ অক্টোবর

খবরের আলো :

 

স্বপ্নের পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ বেশ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। সেতুর সার্বিক অগ্রগতি ৬০ শতাংশ। এর মধ্যে সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়ার কাজ শতভাগ শেষ হলেও পিছিয়ে রয়েছে নদী শাসনের কাজ। ৬৫ শতাংশ মূল সেতু ও ৪৪ শতাংশ নদী শাসনের কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমান গতিতে কাজ চালিয়ে যেতে পারলে ২০১৯ সালেই পুরো পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করা যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আগামী ১৩ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যাবেন। এ সময় তিনি পদ্মা সেতু রেল লিংক প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন।

পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজের অগ্রগতি ও প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সামনে রেখে মঙ্গলবার (২ অক্টোবর) বিকেল ৩টায় রাজধানীর বনানীতে সেতু ভবনে সমন্বয় বৈঠকে বসেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সেতু ভবনের কর্মকর্তাসহ পদ্মা সেতু প্রকল্পের সকল কর্মকর্তারা বৈঠকে যোগ দিয়েছেন। বৈঠকে রেলমন্ত্রীসহ আরও কয়েকজন সংসদ সদস্য যোগ দিয়েছেন।

এদিকে পদ্মা সেতুর নাম ‘শেখ হাসিনা সেতু; রাখার প্রস্তাব উঠলেও তা নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি এই সেতু বঙ্গবন্ধু কন্যার নামে হবে জানালেও দলীয় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন, তিনি রাজি নন। জাতিসংঘ সফর শেষে দেশে ফিরে গত সোমবার (১ অক্টোবর) গণভবনে দলীয় নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে এ কথা জানান শেখ হাসিনা। ওই বৈঠকে পদ্মা সেতু নিয়ে আলোচনার একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতু করবো বলছি, পদ্মা সেতুই হবে। কিন্তু সেতুর নাম শেখ হাসিনা সেতু হবে না। এটা পদ্মা সেতুই হবে। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

পদ্মা সেতুর ৬০ শতাংশ কাজের মধে সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়ার কাজ শতভাগ শেষ হলেও পিছিয়ে রয়েছে নদী শাসনের কাজ। ৬৫ শতাংশ মূল সেতু ও ৪৪ শতাংশ নদী শাসনের কাজ শেষ হয়েছে। মূল সেতু, নদী শাসন, সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়াসহ ৫ পর্যায়ে নির্মাণ করা হচ্ছে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু। চলতি বছরের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নানা প্রতিকূলতা ও জটিলতার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। আরও এক দফা সময় বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে বলে প্রকল্প সূত্র জানায়।

বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু থেকে সরে যাওয়ার পর সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে এই সেতু নির্মিত হচ্ছে। তবে দফায় দফায় বেড়েছে ব্যয়। তিনদফা ব্যয় বৃদ্ধিতে দেশের এই সর্ববৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণে সরকারের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

প্রকল্প সূত্র জানায়, বর্তমানে পদ্মা সেতুর স্প্যানে (সুপার স্ট্রাকচার) রেলওয়ে স্ল্যাব বসানোর কাজ চলছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে সেতুর জাজিরা প্রান্তে ৭-এফ স্প্যানে রেলওয়ে স্ল্যাব বসানোর কাজ শুরু হয়। একটি স্প্যানে মোট ৭২টি স্ল্যাব বাসানো হবে। সেই হিসাবে ৪১টি স্প্যানে রেলওয়ে স্ল্যাব বসবে ২ হাজার ৯৫২টি। এ পর্যন্ত ৮টি রেলওয়ে স্ল্যাব বসানো হয়েছে। ৪১ ও ৪২ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী ৭-এফ স্প্যানের ওপর এসব রেলওয়ে স্ল্যাব বসানো হয়। ৮ টন ওজনের একেকটি স্ল্যাবের দৈর্ঘ্য ২ মিটার এবং প্রস্থ ৫ দশমিক ১৫ মিটার। এ পর্যন্ত পদ্মা সেতুর ১২ পিয়ারের পুরোপুরি কাজ শেষ হয়েছে।

এছাড়া নকশা ত্রুটির কারণে যে ১৪টি পিয়ারের কাজ বন্ধ ছিল তাও চূড়ান্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সেতুর ২৯, ৩০, ৩১, ৩২ নম্বর পিয়ারের নকশা চূড়ান্ত অনুমোদন হয়েছে। বাকি ৭টি পিয়ারের নকশা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। পদ্মা সেতুতে ৪২টি পিয়ার বসানো হবে। পদ্মা সেতুতে সব মিলিয়ে ২৪০টি পাইল বসানোর কথা ছিল। ইস্পাতের এসব পাইল মাটির নিচে ৯৬ থেকে ১২৮ মিটার পর্যন্ত গভীরে বসানো হচ্ছে।

বর্তমানে২৮টি পিয়ারের পাইল বসানোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। সেতুর ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১ ও ৪২ নম্বর পিলারের ওপর পাঁচটি স্প্যান বসানোর মাধ্যমে জাজিরা প্রান্তে সেতুর পৌনে এক কিলোমিটার কাঠামো দৃশ্যমান হয়েছে। ২

০১৫ সালের ডিসেম্বরে সেতুর কাজ শুরু হয়। ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বসানো হয় প্রথম স্প্যানটি। এর প্রায় ৪ মাস পর চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি দ্বিতীয় স্প্যানটি বসে। এর মাত্র দেড় মাস পর ১১ মার্চ শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে ধূসর রঙের তৃতীয় স্প্যান বসানো হয়। এর ২ মাস পর ১৩ মে বসে চতুর্থ স্প্যান। আর পঞ্চম স্প্যানটি বসে এর এক মাস ১৬ দিনের মাথায়। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সেতুতে ৪২টি পিলারের ওপর বসবে ৪১টি স্প্যান। পদ্মা বহুমুখী সেতুর মূল আকৃতি হবে দোতলা। কংক্রিট ও স্টিল দিয়ে নির্মিত হচ্ছে এ সেতুর কাঠামো।

এ বিষয়ে পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম জানান সেতুর ১৪ পিয়ারের নকশা চূড়ান্ত হয়েছে। এগুলো নিয়ে আমাদের এখন আর কোন সমস্যা নেই। নতুন নকশা অনুযায়ী পাইল করা হবে। ইতিমধ্যে প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৫৯ শতাংশ। এর মধ্যে দুই পারের সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়া শতভাগ শেষ হয়েছে। তবে জাজিরা অংশে সংযোগ সড়কের কিছুটা কাজ বাকি আছে। এছাড়া মূল সেতু ৬৫ শতাংশ ও নদী শাসন ৪৪ শতাংশসহ প্রকল্পের অগ্রগতি ভালো।

প্রকল্প সূত্র জানায়, পদ্মা বিশ্বের বিপজ্জনক একটি নদী। উজান থেকে আসা গঙ্গা নদী ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি পদ্মার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। প্রায় ২০ কিলোমিটার পানির প্রবাহ যেখানে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে, এর আশপাশে এসে সরু হয়ে তিন কিলোমিটার এলাকা দিয়ে ভাটির দিকে চলে গেছে। এই নদীর পানির গতি প্রতি সেকেন্ডে চার মিটার। পদ্মা নদী বর্তমানে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া প্রান্ত দিয়ে মাদারীপুর জেলার চর জানাজাতের দিকে বয়ে যাচ্ছে। মাওয়ার দিকে চর পড়লে ভবিষ্যতে পদ্মা তার দিক পরিবর্তন করতে পারে। ঠিক একইভাবে নদীর তলদেশের মাটির স্তরও বদলে যায়। আজ যেখানে শক্ত মাটি রয়েছে, আগামী বছর গতিপথ বদলে গেলে নদীর তলদেশও বদলে যেতে পারে। তাই তলদেশের শক্ত মাটির স্তর কাদামাটিতে পরিণত হতে পারে। একইভাবে আজ যেখানে কাদামাটির স্তর রয়েছে, সেখানে ভবিষ্যতে মাটি শক্ত হয়ে যেতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনা করেই পদ্মার ওপর পিলারসহ সেতুর কাঠামোর নকশা করা হয়েছে।

সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য নদী শাসনের ফলে গতি পরিবর্তন হয়েছে মূল পদ্মা নদীর বেশ কয়েকটি শাখা প্রশাখার। এর জন্য প্রয়োজন পড়েছে বাড়তি জমির। একইসঙ্গে সেতু নির্মাণ কাজের জন্য নদী খননের কাজও চলছে। নদী খননের ফলে উত্তোলিত বালু ও মাটি ফেলার জন্যও বাড়তি জমির প্রয়োজন পড়েছে। মূলত এই দুই কাজের জন্যই পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পে অতিরিক্ত ১ হাজার ১৬২ দশমিক ৬৭ হেক্টর জমির প্রয়োজন পড়েছে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2018 Dailykhaboreralo.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com