শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০৬:১৯ অপরাহ্ন

মাধবপুরে চা বাগানে বিশুদ্ধ পানি, আবাসন ও চিকিৎসা সংকট

খবরের আলো :

সরকার চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে
মোঃ নজরুল ইসলাম খান ,মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি : হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ৫টি চা বাগানে চা শ্রমিকদের বিশুদ্ধ পানি ও আবাসন সংকট রয়েছে। চা শ্রমিকরা এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছে। এরমধ্যে রয়েছে সুপেয় পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, থাকার আবাসনও অপ্রতুল এবং সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থাও রয়েছে নানা সমস্যা। চা বাগানের শ্রম আইন অনুযায়ী বাগানের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের এসব সমস্যা সমাধান করার নিয়ম থাকলেও বাগান কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে অনেকটা উদাসীন। কিন্তু যারা বাগানে কাজ করে না এমন অনেক শতশত বাগানবাসী বাগানের পক্ষ থেকে কোন ধরনের সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই। সরকারি ভাবে চা শ্রমিকদের জীবন মান উন্নয়নের জন্য কাজ করছে করা হলেও এখনো অনগ্রসর চা শ্রমিক জনগোষ্ঠিকে উন্নয়নে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না।
মাধবপুর পরিসংখ্যান অফিসের তথ্যানুযায়ী মাধবপুর উপজেলায় জগদীশপুর, নোয়াপাড়া, বৈকুন্ঠপুর, সুরমা ও তেলিয়াপাড়া চা বাগানে মোট জনসংখ্যা রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার। এরমধ্যে সুরমা চা বাগানে নিয়মিত শ্রমিক ২২শ জন। তেলিয়াপাড়া চা বাগানে প্রায় ৭শ জন, নোয়াপাড়া চা বাগানে প্রায় সাড়ে ৭শ জন, জগদীশপুর চা বাগানে ৬শ, বৈকুন্ঠপুর চা বাগানে ৪শ জন। চা বাগানের পক্ষ থেকে প্রতিবছর পালাক্রমে ২২শ শ্রমিক পরিবারের মধ্যে ছন, বাঁশ, টিন দিয়ে ঘর মেরামত করা হলেও বছর খানেকের মধ্যে এগুলো ভেঙ্গে পড়ে। সুরমা চা বাগানে মোট জনসংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। খানার পরিমাণ হবে প্রায় ৩ হাজার। বাকী ৮শ জন পরিবার তারা নিজ খরচে নিজেদের ঘর নির্মাণ করে থাকে। এগুলো অবস্থা খুবই নাজুক। একটি ঘরে একটি চা শ্রমিক পরিবারের প্রায় ৬/৭জন সদস্য অত্যন্ত ঠাসাঠাসি করে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করে। সুরমা চা বাগানের শ্রমিক নেতা প্রদীপ মুন্ডা জানান, চা শ্রমিকের ঘরগুলো খুবই বাজে অবস্থানে রয়েছে। বৃষ্টির সময় শ্রমিকের ঘর দিয়ে অনবরত পানি পড়ে। যারা বাগানে নিয়মিত শ্রমিক বাগানের পক্ষ থেকে তাদের ঘর নির্মাণ করা হলেও তা টেকসই নয়। এ কারণে প্রতিবছর ছন, বাঁশ দিয়ে নির্মিত ঘরগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। আর যারা অনিয়মিত শ্রমিক তাদের কষ্টের কোন সীমা নেই তারা বাগানের পক্ষ থেকে কোন ধরনের ঘর, পানি, চিকিৎসা, রেশন তলবের কোন সুবিধা পায় না। এসব চা শ্রমিক পরিবার তারা নিজেদের টাকায় কোন রকমে মাথা গোজাবার ঠাঁই করেন। তেলিয়াপাড়া চা বাগানের রঞ্জিত গোয়ালা জানান, চা শ্রমিকরা বাগানে মানবেতর জীবন যাপন করেন। বাগানে শ্রমিকরা দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করেন। অনগ্রসর এই জনগোষ্ঠি চিকিৎসা, শিক্ষা, আবাসন সহ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ১৬ ও ১৭ নং বস্তির চা শ্রমিকদের জীবনমান খুবই নিম্ন মানের। বাগানের কোন বাসিন্দা অসুস্থ হলে সে বাগানের নিয়মিত শ্রমিক হলে নামে মাত্র চিকিৎসা পায়। প্রতিটি বাগানে একজন এমবিবিএস ডাক্তার সহ হাসপাতালের সকল সুবিধাদি থাকার কথা থাকলেও বাগানে কোন এমবিবিএস ডাক্তার নেই। হাসপাতাল রয়েছে নামে মাত্র। এখানে ড্রেসার ও কম্পাউন্ডার দ্বারা চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। জগদীশপুর চা বাগানের শ্রমিক নেতা সাধন সাওতাল জানান, কোন শ্রমিক অসুস্থ হলে শুধু ব্যাথার ট্যাবলেট দিয়েই দায় সারেন কর্তৃপক্ষ। সুপেয় পানির কোন ব্যবস্থা নেই। বাগান পরিচালিত যে পানি সরবরাহ করা হয় তা খুবই সীমিত। শুষ্ক মৌসুমে এখন চা বাগানে পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। কোন নারী শ্রমিক গর্ভবর্তী অবস্থায় অসুস্থ হলে ওই গর্ভবর্তী মাতা’র চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা নেই। সুরমা চা বাগানের শিক্ষক বিশ্বজিত মুন্ডা জানান, চা বাগানে প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থা তেমন ভাল নেই। বাগান পরিচালিত প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হয় শ্রমিকদের হারে। এছাড়া বাগানে কোন বিদ্যালয় করতে গেলে ভূমির সরকারি মালিকানা জটিলতায় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো জাতীয়করণ করা হচ্ছে না।
নোয়াপাড়া চা বাগানের খেলু নায়েক জানান, বাগান কর্তৃপক্ষ চা শ্রমিকদের জন্য যে সুযোগ সুবিধা দেয় তা খুবই নগন্য। এখন একজন শ্রমিকের দৈনিক হাজিরা মাত্র ১শ ২ টাকা এবং প্রতি সপ্তাহে সাড়ে ৩ কেজি করে চাল বা আটা দেওয়া হয়। বাগানের পাশাপাশি সরকারিভাবে চা শ্রমিকদের জীবন মান উন্নয়নের জন্য টেকসই উন্নয়ন প্রকল্প নিলে চা শ্রমিকরা উন্নয়নের মূল স্রোতে ফিরে আসতো। নোয়াপাড়া চা বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক সোহাগ মাহমুদ জানান, নোয়াপাড়া চা বাগানে চা শ্রমিকদের শিক্ষা চিকিৎসা ও আবাসন ও পানীয় জলের ভাল ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বাগানের পাশাপাশি সরকারিভাবে চা শ্রমিকদের বড় পরিসরে সহযোগিতা করা প্রয়োজন।
মাধবপুর সমাজসেবা কর্মকর্তা সোলাইমান মজুমদার জানান, বর্তমান সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় অনগ্রসর চা শ্রমিক জনগোষ্ঠিকে (এসডিজি) টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার পৌঁছার লক্ষ্যে শিক্ষা, আবাসন, স্বাস্থ্য ও খাদ্যে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা পড়ছে। স¤প্রতি ৫টি চা বাগানে চা শ্রমিক জনগোষ্ঠির মধ্যে আড়াই কোটি টাকার নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে এ অর্থ বিতরণ করেন। এর আগে প্রতিটি শ্রমিক পরিবারকে চাল, ডাইল, লবন, তেল বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয়। মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মলি­কা দে জানান, চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য সরকারিভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে। এখনো যেসব চা শ্রমিক পরিবার সুবিধা বঞ্চিত রয়েছে তাদের উন্নয়নের জন্য আমরা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছি। বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তারদের নিদের্শ দেওয়া হয়েছে।

 

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2018 Dailykhaboreralo.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com