শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০৬:০৪ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
দাউদকান্দি সেতুর টোলে সাংবাদিকের গাড়ি ডাকাতি কোভিড মোকাবিলায় বাংলাদেশের দৃষ্টান্ত অনন্য : ডব্লিউএইচও আইজিপির সাথে বিএনপির প্রতিনিধি দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত বদলগাছীতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কৃষি জমিতে চলছে পুকুর খনন জান্নাত একাডেমী হাই স্কুলে শহীদ দিবস উদযাপন দোহারে মুজিববর্ষ উপলক্ষে ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত চাষের নতুন পদ্ধতি যন্ত্রের ব্যবহার বাড়বে কমবে সময়,শ্রম, ও খরচ – কৃষিমন্ত্রী  করনা মোকাবেলায় স্বর্ণপদক পেলেন ইউপি চেয়ারম্যান  আমিনুর রহমান আজ সৈয়দ মুহাম্মদ আহমদ উল্লাহ’র প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী সাভারে ঝুলন্ত অবস্থায় অন্তঃসত্ত্বার মরদেহ উদ্ধার

কানাডা সরকারই ছাড়তে চায় না নূর চৌধুরীকে

 

বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি নূর চৌধুরীকে কানাডা থেকে বহিষ্কার বা বহিঃসমর্পণের মাধ্যমে বাংলাদেশের কাছে তুলে দিতে বড় অনীহা ওই দেশের সরকারেরই। গত সোমবার রাতে কানাডার আদালতে শুনানির সময় বাংলাদেশ পক্ষ কানাডায় নূর চৌধুরীর ‘লিগ্যাল স্ট্যাটাস’ জানতে চাইলে কানাডার অ্যাটর্নি জেনারেলের পক্ষ থেকে আদালতকে বলা হয়েছে, নূর চৌধুরীর ‘লিগ্যাল স্ট্যাটাস’ না জানায় কানাডায় জনগণের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সোমবার রাতের শুনানির ভিত্তিতে রায় দেওয়া হবে, নাকি আরো শুনানি নেওয়া হবে সে সিদ্ধান্তই এখন নেবেন কানাডার অন্টারিওর ফেডারেল আদালত। কানাডার অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর প্রায় ১০ বছর ধরে নূর চৌধুরীর একটি আবেদন ঝুলিয়ে রেখে কার্যত তাঁকে ওই দেশে থাকার সুযোগ করে দিয়েছে। শিগগির সেই আবেদন নিষ্পত্তি হওয়ারও কোনো লক্ষণ দেখা না যাওয়ায় বাংলাদেশ সরকার গত বছরের জুন মাসে আদালতের নির্দেশনা চেয়ে মামলা করে। বাংলাদেশের পক্ষে আইনি প্রতিষ্ঠান ‘টরিস এলএলপি’ মামলায় কানাডার অ্যাটর্নি জেনারেলের পাশাপাশি খুনি নূর চৌধুরীকেও পক্ষভুক্ত করেছে।

২০০৪ সালে কানাডার আদালতে ‘কানাডার নাগরিকত্ব ও অভিবাসন মন্ত্রী বনাম এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী ও রাশিদা খানম’ মামলার নথি সংগ্রহ করা হয়েছে কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে। ওই নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে বাংলাদেশ ও কানাডা তাদের নীতি না বদলালে নূর চৌধুরীকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর না করার অবস্থানেই অটল থাকবে কানাডা। কানাডা সরকার সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অনেক আগেই এবং আদালতকেও জানিয়েছিল তা।

পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোলের অটোয়া অফিস ২০০৪ সালের ২৪ মে কানাডার ইমিগ্রেশন ও রিফিউজি বোর্ডকে জানায়, “বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড প্রথা থাকায় কানাডার বিচার বিষয়ক মন্ত্রণালয় নূর চৌধুরীকে অচিরেই ‘এক্সট্রাডিট’ (বহিঃসমর্পণ) করবে না। দণ্ডাদেশের বিষয়ে কানাডা বা বাংলাদেশের নীতির পরিবর্তন হলে তখন তাঁকে বহিঃসমর্পণ করা হতে পারে।”

বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত ওই খুনি সস্ত্রীক কানাডায় ‘শরণার্থী’ মর্যাদার জন্য আবেদন করেও কয়েক দফায় তা পেতে ব্যর্থ হন। কানাডার আদালতে সে সময় চলা মামলায় গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে যে নূর চৌধুরী বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যে অপরাধ (হত্যা ও ষড়যন্ত্র) করেছেন তা কানাডায়ও অপরাধ হিসেবে গণ্য। কানাডায় এমন অপরাধ করলে তাঁর ন্যূনতম ১০ বছরের সাজা হতো। তাই এমন অপরাধ সংঘটনকারী ও তাঁর স্ত্রী কানাডায় প্রবেশাধিকারই রাখেন না।

নূর চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী রাশিদা খানম শরণার্থী মর্যাদা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এর পাশাপাশি নূর চৌধুরীর আইনজীবীর দাবি ছিল, তাঁর মক্কেল বিচারের জন্য বাংলাদেশের আদালতে হাজির হওয়ার নোটিশ পাননি। তবে আদালত সেই যুক্তি খারিজ করে দিয়ে বলেছেন, নূর চৌধুরী ইচ্ছা করেই বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়ায় উপস্থিত হননি বলেই প্রতীয়মান হয়।

কানাডার আদালত নূর চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রীর ‘শরণার্থী’ মর্যাদার আবেদন প্রত্যাখ্যান করলেও মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপারে কানাডা সরকারের অবস্থানসহ সার্বিক পরিস্থিতি আমলে নিয়ে তাঁদের বহিঃসমর্পণ করার বিপক্ষেই মত দিয়েছিলেন। তবে বাংলাদেশের কাছে সরাসরি তুলে দেওয়ার বদলে তাঁকে কানাডা থেকে বহিষ্কার বা বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশে পাঠানোর সুযোগ ছিল ওই রায়ে।

কানাডার ফেডারেল আদালতে ‘হেলম বনাম কানাডা (অভিবাসন ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী), [১৯৯৬]’ মামলার রায়ের ৩১তম অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ টেনে নূর চৌধুরী ও রাশিদা খানমের মামলায় আদালত বলেছিলেন, বিদেশি কোনো সরকার বহিঃসমর্পণ-প্রক্রিয়ার উদ্যোগ নিক বা না নিক কানাডা চাইলে বহিষ্কারের ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে পারে।

নূর চৌধুরীর ঘৃণ্য অপকর্মের কথা বিভিন্ন সময় প্রকাশিত হয়েছে কানাডার গণমাধ্যমেও। কানাডার শতবর্ষী নিউজ ম্যাগাজিন ম্যাক্লিন’স-এ ২০১১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নূর চৌধুরীকে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘দি অ্যাসাসিন অ্যামং আস’ (হত্যাকারী আমাদের মধ্যে)। শিরোনামের নিচে কিছুটা ছোট হরফে উল্লেখ ছিল “নূর চৌধুরী ফেসেস এক্সিকিউশন ফর কিলিং বাংলাদেশ’স প্রেসিডেন্ট। দ্যাটস হোয়াই হি’জ সেইফ ইন কানাডা” (বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে হত্যার দায়ে নূর চৌধুরী মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি। এ কারণেই তিনি কানাডায় নিরাপদে আছেন)।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর নূর চৌধুরীসহ অন্য খুনিদের বিদেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোতে কূটনীতিক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করে তখনো খুনি নূর চৌধুরী বিদেশে বাংলাদেশি কূটনীতিক হিসেবে এ দেশের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার তাঁকে দেশে ফেরার নির্দেশ দিলে সস্ত্রীক তিনি কানাডায় চলে যান।

আওয়ামী লীগ সরকার ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুরু করার উদ্যোগ নিলে ১৯৯৯ সালে নূর চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী রাশিদা খানম কানাডায় শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় পাওয়ার আবেদন করেন। কিন্তু আদালত ওই আবেদন খারিজ করে দিলে তাঁরা উচ্চ আদালতে আবেদন করেন। ২০০৭ সালে কানাডার সর্বোচ্চ আদালতও তাঁদের আবেদন খারিজ করে দেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবারও সরকার গঠন করার পর নূর চৌধুরী বাংলাদেশে ফাঁসির আশঙ্কা প্রকাশ করে তাঁর বহিষ্কারাদেশের বিরুদ্ধে ‘প্রি-রিমুভাল রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট’ আবেদন করেন। কানাডার অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় তা গ্রহণ বা বাতিল কোনোটিই না করে ঝুলিয়ে রেখেছে।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নূর চৌধুরীকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি বারবার তোলা হলেও কানাডা তাতে ইতিবাচক সাড়া দেয়নি।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2018 Dailykhaboreralo.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com