বুধবার, ১৮ মে ২০২২, ০৫:০৫ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
ঝিনাইগাতীতে বঙ্গবন্ধু জাতীয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত আদমদীঘিতে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালিত আদমদীঘিতে ৯০ পিস এ্যাম্পলসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেফতার : বাইক জব্দ শ্রীবরদীতে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা নতুন নির্দেশনা, এবার উপবৃত্তির টাকা মিলবে সহজে, স্বস্তিতে অভিভাবকেরা বিশ্বম্ভরপুরে কালভার্ট ভেঙে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ভয়াবহ বন‍্যা পরিস্থিতি আসামে! ভেসে গেল ট্রেন, উদ্ধার ২৮০০ যাত্রী রংপুরে ম্যানেজারের বিরুদ্ধে ৪০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মালিকের সংবাদ সম্মেলন ডিমলায় জাল ব্যবসায়ীকে ৫০০০ টাকা জরিমানা তাহিরপুরে ৩৭ পিচ ইয়াবাসহ আটক-১ 

জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে পানি ফলের চাষ,বেকার শ্রমিকদের সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থানের

খবরের আলো  :
শেখ আমিনুর হোসেন,সাতক্ষীরা ব্যুরো চীফ: দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সীমান্তবর্তী সাতক্ষীরা জেলায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে পানি ফল (পানি শিংড়া)
ফলের চাষ। জেলার জলাবদ্ধ পতিত জমির সর্বত্রই এখন চাষ হচ্ছে এ ফলের। খেতে বেশ সুস্বাদু ও কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় এ চাষে এখন জনপ্রিয় হয় উঠেছে। এ চাষের ফলে জেলার বেকার শ্রমিকরা কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে। সাতক্ষীরায় উৎপাদিত পানি ফল এখন জেলার চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত করা হচ্ছে। 
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় সাড় ৭ শত বিঘা জমিতে পানি ফলের চাষ করা হয়েছে। কম খরচ অধিক লাভ হওয়ায় দিন দিন পানি ফলের চাষ বাড়ছে। পানি ফল চাষে এক দিকে কৃষকরা লাভবান হচ্ছে ,অপর দিকে বেকারত্ব দূর হচ্ছে।  
জানা গেছে, সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন স্থানে পানি নিষ্কাশনের সুষ্টু ব্যবস্থা না থাকায় বিস্তির্ণ এলাকায় প্রতিবছর দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। আর এই জলাবদ্ধ জমিতে যখন অন্য ফসল চাষাবাদ করা যায়না তখনই কৃষকরা এই জলাবদ্ধ জমিতে পানি ফল চাষ করে সফল হয়েছেন। প্রতি বছর আষাঢ় ও শ্রাবন মাস হতে এই পানি ফল চাষাবাদের কাজ শুরু হয়। আর আশ্বিন থেকে শুরু হয় মাঘ মাস পর্যন্ত চলে পানি ফল বিক্রি করা। পানিফল কচি অবস্থায় লাল,পরে সবুজ এবং পরিপক্কতা হলে কালো রং ধারন করে। ফলটির পুরু নরম খোসা ছাড়ালেই পাওয়া যায় হৃৎপিন্ডাকার বা ত্রিভুজাকতির নরম সাদা শাসঁ। কাঁচা ফলের নরম শাসঁ খেতে বেশ সুস্বাদু। প্রতি ১০০ গ্রাম পানিফল ৮৪.৯ গ্রাম পানি, ০.৯ গ্রাম খনিজ পদার্থ, ২.৫ গ্রাম আমিষ, ০.৯ গ্রাম চর্বি, ১১.৭ গ্রাম শর্করা, ১০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ০.৮ মিলিগ্রাম লহ, ০.১১ মিলি গ্রাম ভিটামিন বি-১, ০.০৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-২ ও ১৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ রয়েছে। তাছাড়া এ ফলে ৬৫ কিলাক্যালরি খাদ্যশক্তি থাকে। পানিফলে পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যালসিয়াম রয়েছে। দেহের প্রয়োজনীয় খনিজ লবণগুলার মধ্যে ক্যালসিয়াম অন্যতম। ফসফরাসের সহযোগিতায় শরীরের হাড় ও দাঁতের গঠন এবং মজবুত করা ক্যালসিয়ামের প্রধান কাজ। লোহ অত্যন্ত জরুরি একটি খনিজ লবন। লোহর অভাব মানবদেহ অপুষ্টিজনিত রক্তশূণ্যতা দেখা দেয়। ছোট ছেলেমেয়েরা এবং গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েরা অতি সহজে রোগের শিকার হয়। পানি ফলে যথেষ্ট পরিমাণ লোহ পাওয়া যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম পানি ফলে ভিটামিন ‘সি’ এর পরিমান ১৫ মিলিগ্রাম আর শসাতে আছে ভিটামিন ‘সি’ মাত্র ৫ মিলিগ্রাম। ভিটামিন ‘সি’ শরীর চামড়া, দাঁত ও মাড়ির স্বাস্থ্য রক্ষায় অপরিহার্য। তাছাড়া ভিটামিন ‘সি’ অস্ত্র লোহ শোষণ সাহায্য করে। বাংলাদেশর শতকরা ৯৩ ভাগ পরিবার ভিটামিন ‘সি’ এর অভাবে ভুগছে। খাদ্য ভিটামিন ‘সি’ এর ঘাটতি বিবচনা করে এ ফলের প্রতি আমাদের অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পানি ফলে কাঁচা খাওয়া হয়, তবে সিদ্ধ করেও খাওয়া যায়। কাঁচা পানিফল বলোকারক দুর্বল ও অসুস্থ মানুষের জন্য সহজপাচ্য খাবার। ফলের শুকনা শাঁস রুটি করে খেলে এলার্জি ও হাত-পা ফোলা রোগ উপশম হয়। পিওপ্রদাহ, উদরাময় ও তলপেটের ব্যথ্যা উপশম পানিফল খাওয়ায় প্রচলন রয়েছে। বিছাপাকা কামড়র যন্ত্রনায় থেতলানা কাঁচা ফলের প্রলোপ দিলে উপকার পাওয়া যায়। সাতক্ষীরা জেলার সদর, কলারোয়া, দেবহাটা, কালিগঞ্জ, আশাশুনি সদরের আংশিক ও শ্যামনগর উপজেলায় জলাবদ্ধ এলাকার চাষিরা এই পানিফল চাষ করে অধিক লাভবান হচ্ছেন। ফলে জনপ্রিয় হয় উঠছে এ ফলের চাষ। সেই সাথে বাড়ছে ফলটির জনপ্রিয়তা।
বর্তমান সাতক্ষীরা জেলার সকল উপজলার কৃষরা এই ফল চাষ করে আশানুরুপ সাফল্য পেয়েছেন। বাংলাদেশের দক্ষিণ অবস্থিত এবং জলাবদ্ধতা জেলা হওয়ায় পতিত জমিতে চাষ করা হচ্ছে এ ফল। প্রতি বিঘা জমিতে চাষ করতে একজন কৃষকের খরচ হয় মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। তা থেকে তিনি সকল প্রকার খরচ বাদে বিঘা প্রতি প্রায় ৩০ হাজার টাকার পানি ফল বিক্রি করেও থাকেন। তাছাড়া এ চাষে অনেক বেকার শ্রমিকের  কর্মসংস্থা হয়েছে। 
দেবহাটা উপজেলার সখিপুর গ্রামের পানিফল চাষি জিয়াদ আলীর ছেলে আকবর আলী জানান, তিনি ২ বিঘা জমি লিজ নিয়ে পানি ফলের চাষ শুরু করেছেন। শুরুতেই এই চাষে লাভের আশা দেখিয়েছেন তাকে। তিনি আগামী বছর আরও বেশি জমি নিয়ে চাষ করবেন বলেও জানান। 
আরেক পানিফল চাষি দক্ষিণ সখিপুর গ্রামের ইসমাইল হাসান জানান, তিনি ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে পানিফল চাষ করে আসছেন। এবছর তিনি ১৫ বিঘা জমিতে এ ফল চাষ করেছেন। তিনি ১৩/১৪ দিন পর পর ফল উত্তালন করেন। বিঘা প্রতি ১২/১৫ মন ফল পাচ্ছেন তিনি। যার প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে পাইকারি বিক্রয় করে লাভবানও হচ্ছেন। 
কলারোয়া উপজেলার গোপিনাথপুর গ্রামের পানিফল চাষী আব্দুল আজিজ গাজী ও ঝিকরা গ্রামর গোলাম মোস্তফা জানান, প্রতিবছর এলাকায় জলাবদ্ধ জমি বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যার কারণে পতিত জমিতে বিকল্প হিসেবে তারা পানিফল চাষ করছেন। তারা বলেন, কলারোয়া উপজেলায় গত চার বছর আগে গোপিনাথপুর গ্রামর আজিবর নামে এক কৃষক কালীগঞ্জ উপজেলা থেকে বীজ এনে পানিফলের চাষ করে ভাল লাভবান হন। এরপর থেকে জলাবদ্ধ পতিত জমিতে অনেক কৃষকই বানিজ্যিকভাব পানিফল চাষ শুরু করেন।
সখিপুর ও ডেল্টা মোড় এলাকার খুচরা পানিফল ব্যবসায়ী জামাল উদ্দীন ও আনছার আলী জানান, বর্তমানে ২০ টাকা দরে পানিফল বিক্রয় করছেন। প্রতি দিন তারা ২০ থেকে ৩০ কেজি ফল বিক্রয় করে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা লাভ করেন। তাদের এটি মশুমী ব্যবসা বলে তারা আরও জানান। 
পাইকারি পানিফল ব্যবসায়ী কামটা গ্রামের বাবু সরদার জানান, চাষের মৌসুম আসার আগে তিনি অর্ধ শতাধিক চাষীর মাঝে অর্থ বিনিয়াগ করেন। পরবর্তীতে ফলন আসার পর বাজার দর অনুযায়ী উৎপাদিত ফসল ক্রয় করেন। এভাবে ১৫ বছরের বেশি সময় তিনি পানিফল ব্যবসায় নিয়াজিত আছেন। প্রতিদিন তিনি ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, বরগুনা, চিটাগাং, সিলট, রাজশাহী, বেনাপোল, যশোর, নাটোর, বগুড়া, দর্শনা, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় এ ফল রপ্তানি করেন। 
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কাজী আব্দুল মান্নান জানান, বাংলাদেশে এ ফলটিকে পানিফল বা শিংড়া বললেও বৈজ্ঞানিক নাম ‘বর্ষজীবী জলজ উদ্ভিদ’। বনলতার মত গাছটি ৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। পানির নিচে মাটিতে এর শেকড় থাকলেও পানির উপর ভেসে থাকে পাতাগুলো। ফলগুলোতে শিং-এর মত কাঁটা থাকে বলে এর নামকরণ হয়েছে শিংড়া। একটু পরিপুষ্ট হলে লাল ও সবুজ এবং সব শেষে কালো রঙ ধারণ করে। ফলটির খোসা ছাড়িয়ে ভেতরের মিষ্টি শাঁসটি খেতে বেশ সুস্বাদু। প্রতি কেজি পানি ফল ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রয় হচ্ছে।  ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় ৩ হাজার বছর আগে চীনে পানিফলের চাষ হতো।

সেই হিসাবে পানিফলক একটি প্রাচীন ফল বলা যেতে পারে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2018 Dailykhaboreralo.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com