সোমবার, ২৩ নভেম্বর ২০২০, ১২:১০ পূর্বাহ্ন

শ্রীপুরে দৃষ্টিহীন খাইরুলের সংসার চলে সততার দোকানে

খবরের আলো :

 

 

মহিউদ্দিন আহমেদ ,শ্রীপুর প্রতিনিধি:শ্রীপুর উপজেলার গাজীপুর গ্রামের দৃষ্টিহীন খায়রুল ইসলামের সংসার চলে সততার দোকানে“মামা একটি কলম নিলাম, ৫টাকা রেখে গেলাম”। একটি খাতা নিলাম, ২০ টাকা দিলাম। প্রতিদিন বিদ্যালয় চলাকালীন সময়ে নিয়মিত এই চিত্র দেখা যায় গাজীপুর  সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ সংলগ্ন একটি ক্ষুদ্র একটি দোকানে। যেখানে ক্রেতা এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আর বিক্রেতা দৃষ্টিহীন খাইরুল ইসলাম। শিক্ষার্থীদের সততা ও ভালবাসার উপর ভর করে এভাবেই চলছে খাইরুলের দিনকাল। ক্ষুদ্র এই দোকান থেকে যে আয় হয় তা দিয়েই কোনমতেই টেনেটুনে চলছে তার সংসার।গাজীপুর গ্রামের তাইজুল ইসলামের সন্তান খাইরুল ইসলাম। সম্প্রতি বয়স ৪০ এর কোটায় পৌঁছেছে। দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে সংসার তার। সহায় সম্বল বলতে শুধু রয়েছে ভিটেমাটি। ছোটকালে তার পরিবার অভাব ও দারিদ্রের কষাঘাতে পিষ্ট হওয়ায় ইচ্ছা থাকা সত্বেও লেখাপড়ার গন্ডি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেশি যেতে পারেননি। এরপর মূলত শ্রম বিক্রি করেই চলত তার দিনকাল। ২০১১ সালের দিকে তার মাথা ব্যাথা শুরু হয়। পরে দেখা দেয় চোখের সমস্যা।চিকিৎসকরা জানান, গ্লোকমায় আক্রান্ত হয়েছে তার দু’চোখ, নির্দেশনা দেন উন্নত চিকিৎসার। কিন্তু তার সে সুযোগ আর হয়ে উঠেনি। ধীরে ধীরে কমতে থাকে চোখের আলো। ২০১২ সালের দিকে পুরোপুরি দৃষ্টিহীন হয়ে পড়েন তিনি।এ ঘটনায় তার পুরো পরিবারে নেমে আসে অন্ধকার। থমকে দাঁড়ায় দিন আনা দিন খাওয়া একটি সংসার। এরপর অনেকেই ভিক্ষাবৃত্তিতে নামার পরামর্শ দেন তাকে সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করে দেন ঘৃণ্যতম এই প্রস্তাব। তবে দমে যাওয়ার পাত্র নন এই খাইরুল। তিনি তার পরিবারের কাছে ব্যবসা করবেন বলে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান, তবে বাধ সাধেন সবাই। সবারই এক কথা তার দৃষ্টিহীনতার সুযোগে চুরি হয়ে যাবে সবকিছু, সে হারাবে সর্বস্ব। এবার মাথায় আসে ভিন্ন ধর্মী চিন্তা। শিশুদের সততায় তাকে জোগায় আশা। শিশু শিক্ষার্থীদের সততা ও ভালবাসায় তিনি বাড়ির কাছে প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকায় ক্ষুদ্র দোকান খুলে বসেন। যেখানে তার ক্রেতা বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরা।প্রতিদিন বিদ্যালয়ের সময় হলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই তাকে বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের পাশের দোকানে আনা নেয়ায় সহায়তা করেন। কারো কিছু কোন প্রয়োজন হলে নিজেরা ইচ্ছেমত খাইরুলের দোকান থেকে পন্য নিয়ে যান, দাম তুলে দেন তার হাতে। বিকেলে সারাদিনের বিক্রির টাকাও  শিক্ষার্থীরা গুনে তার হাতে ধরিয়ে দেন। এভাবেই দীর্ঘ সাত বছর ধরে দোকান পরিচালনা করে দৃষ্টিহীন খাইরুল শিক্ষার্থীদের অতি আপনজন হয়ে উঠেছেন। তিনি এখন সবার খাইরুল মামা।খাইরুলের ভাষ্য, তার এই ক্ষুদ্র দোকানে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চাহিদা মেটে না। তবু সামর্থ অনুযায়ী বিভিন্ন শিক্ষা উপকরন ও টিফিনের খাবার বিক্রি করে থাকেন। শিক্ষার্থীদের সততার উপর ভরসা করেই তার এই দোকান পরিচালনা করা হয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পন্য নিয়ে টাকা না দেয়ার মানসিকতা নেই। এর জন্যই তিনি দোকান পরিচালনা করতে পারেন। প্রতিদিন তার বিক্রি হয় ৬-৭’শত টাকা। আয় দাড়ায় ১’শ টাকা। এ দিয়েই তার চার সদস্যের পরিবারের আহারের যোগান হয়। দুই সন্তানের জনক খাইরুলের মেয়ে এবার এই বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা দিয়েছেন, ছেলে প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। জীবন মান নিয়ে খাইরুলের কোন আক্ষেপ নেই তবে নিজে চোখের চিকিৎসা করাতে না পারায় তার খেদ রয়ে গেছে। এখনও স্বপ্ন রয়েছে কারো সহায়তা পেলে ফের চোখের চিকিৎসা শুরু করবেন। যদি ফিরে আসে দৃষ্টি।গাজীপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহিনুর রহমান জানান, খাইরুলের অসহায়ত্ব ও মানবিকতার কথা বিবেচনা করে আমরা বিদ্যালয় এলাকায় তাকে ক্ষুদ্র দোকান পরিচালনার অনুমতি দিয়েছি। বিদ্যালয়ে আমরা শিশুদের স্বাভাবিক পাঠদানের পাশাপাশি নীতি, নৈতিকতা, সততা ও আদর্শের শিক্ষা দিয়ে থাকি। এই শিক্ষায় আলোকিত হয়ে বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা দৃষ্টিহীন খাইরুলের দোকান চালাতে প্রতিনিয়ত সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। এটি সত্যিই অনুকরণীয়।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2018 Dailykhaboreralo.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com