সোমবার, ২৩ নভেম্বর ২০২০, ০৭:৫২ পূর্বাহ্ন

গাজীপুরে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ সড়ক অবরোধ

খবরের আলো:

 

 

গাজীপুর সংবাদদাতাঃ গাজীপুরে কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা শতভাগ বেতনভাতা পরিশোধ এবং কাজে যোগ দেওয়ার দাবিতে বুধবার বিক্ষোভ করেছে। এসময় ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দুটি অবরোধ করেছে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়েছে। এতে পুলিশসহ অন্তত ১২জন আহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ার সেল ও সর্টগানের গুলী ছুঁড়েছে।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুশান্ত সরকার ও স্থানীয়রা জানান, করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে লকডাউন চলাকালে যে সকল কারখানায় শ্রমিকরা কাজ করতে পারেনি শ্রম আইন অনুযায়ী তাদের বেতনের ৬০শতাংশ প্রদানের সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। কিন্তু গাছার সাইনবোর্ড এলাকার ব্যান্ডো ফ্যাশন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা ৬০শতাংশ বেতনের পরিবর্তে শতভাগ বেতন পরিশোধের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানায়। এছাড়াও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সরকারের নির্দেশনা ও স্বাস্থ্য বিধি অনুযায়ী অনুযায়ী সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখতে আংশিক শ্রমিক দিয়ে সাময়িকভাবে স্বল্প পরিসরে কারখানা চালু করার নির্দেশ দেওয়া হলেও সকল শ্রমিককে কাজে নিয়োগের দাবি জানায় শ্রমিকরা। এ কারখানায় প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক কাজ করে। শ্রমিকদের ওই দাবী মেনে না নেওয়ায় তারা গতকাল বুধবার সকাল হতে কারখানার গেইটের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে।
তিনি জানান, সকাল ৯টার দিকে শ্রমিকরা কারখানার পার্শ্ববর্তী ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উপর অবস্থান নিয়ে অবরোধ করে। এতে মহাসড়কের উভয়দিকে যানবাহন বন্ধ হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। কিন্তু শ্রমিকরা ওই সরকারি নির্দেশ না মেনে তাদের দাবীতে বিক্ষোভ করতে থাকে। দুপুরের দিকে তারা পার্শ্ববর্তী ইন্টারস্টপ পোশাক কারখানার সামনে গিয়ে তাদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য ওই কারখানার শ্রমিকদের আহবান জানালে তারা যোগ দেয়নি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আন্দোলনরত শ্রমিকরা মহাসড়কে গাড়ি একং ঢিল ছুড়ে ইন্টারস্টপ পোশাক কারখানা ভাংচুর শুরু করে। পুলিশ তাদের বাঁধা দিলে শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট পাথর ছুড়তে থাকে। এসময় পুলিশ লাঠি চার্জ করলে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এঘটনায় পুলিশসহ অন্ততঃ ১২জন আহত হয়েছে। এক পর্যায়ে পুলিশ অন্তত ২০/২২ রাউন্ড টিয়ার সেল ও সর্টগানের গুলি ছুড়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দুপুরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলে প্রায় ৪ ঘন্টা পর ওই মহাসড়কে যানবাহন চলাচল শুরু হয়।
এদিকে একই দাবিতে বুধবার গাছার তারগাছ এলাকাস্থিত এ্যাবা ফ্যাশন লিমিটেড নামের পোশাক কারখানায় শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধ করেছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুশান্ত সরকার জানান, করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে এ কারখানায় আংশিক শ্রমিক দিয়ে স্বল্প পরিসরে কারখানার উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। শ্রমিকরা গত কয়েকদিন ধরে কর্তৃপক্ষের কাছে ওই ছুটি কালীন সময়ে ৬০শতাংশ বেতনের পরিবর্তে শতভাগ বেতন প্রদান ও সকল শ্রমিককে কাজে নিয়েগের দাবি জানিয়ে আসছিল। দাবী মেনে না নেওয়ায় মঙ্গলবার কিছু শ্রমিক কারখানায় কর্মরত অন্য শ্রমিকদের উস্কানি দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে। ফলে শ্রমিক অসন্তোষের আশংকায় কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষনা করে নোটিশ টানিয়ে দেয় কারখানা কর্তৃপক্ষ। বুধবার সকালে কাজে যোগ দিতে গিয়ে শ্রমিকরা কারখানা বন্ধ দেখতে পেয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। এসময় তারা কারখানা খুলে দেয়াসহ শতভাগ বেতন পরিশোধের দাবিতে পার্শ্ববর্তী ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ করে রাখে। এতে উভয়দিকে যানবাহন আটকা পড়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।

এ্যাবা কারখানার একাধিক শ্রমিক জানান, কারখানা খোলার পর থেকে তারা জীবনের ঝুকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন, তারপরও কর্তৃপক্ষ বলছে ৬০ ভাগ বেতন দিবে। ওই টাকায় আমাদের ঘরভাড়া, খাওয়া দাওয়া কোন কিছুই হবে না। এতে আরো অভাবের মধ্যে পড়তে হবে। তাই পুরো বেতন দিতে হবে।

এ্যাবা ফ্যাশন লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ) আফতাব উদ্দিন আহম্মেদ শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের এক নোটিশে উল্লেখ করেছেন, ৫ মে শ্রমিকরা সু-নির্দিষ্ট কোন বৈধ আইনগত দাবি না থাকা সত্ত্বেও বে-আইনিভাবে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রাখছেন এবং চালু থাকা অন্য সেকশনের কাজ জোরপূর্বক বন্ধ করতে বাধ্য করেছে। তারা সকলকে ভয়ভীতি প্রদান করে কারখানায় অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। কারখানা কর্তৃপক্ষ বার বার অনুরোধ কর সত্ত্বেও শ্রমিকরা উৎপাদন কাজে যোগদান করেনি। এ কার্যক্রম অবৈধ ধর্মঘটের সামিল। যার কারনে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে শ্রম আইন ২০০৬ এর ধারা ১৩ (১) অনুযায়ী অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ ঘোষনা করা হলো।

শিল্প পুলিশের ইন্সপেক্টর ইস্কান্দর হাবিবুর রহমান জানান, বুধবার দুপুরে পুলিশের সঙ্গে কারাখানা কর্তৃপক্ষের আলোচনা হয়। আলোচনা শেষে বিষয়টি নিয়ে বৃহষ্পতিবার বিজিএমইএ’র সঙ্গে আলোচনার আশ্বাস দিলে শ্রমিকরা সরকারি সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে বৃহস্পতিবার থেকে কারখানার খুলে দেয়ার শর্তে আন্দোলন ত্যাগ করে।  আন্দোলনরতরা সোয়া ১২টার দিকে মহাসড়কের উপর থেকে সরে গেলে প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ওই মহসড়কে যানবাহন চলাচল শুরু হয়।

এছাড়া শিল্প পুলিশের ইন্সপেক্টর ইসলাম হোসেন জানান, মহানগরীর সাইনবোর্ড এলাকার গ্রীন সোয়েটার কারখানার শ্রমিকরা ফেব্রুয়ারি ও মার্চের বকেয়া বেতনের দাবিতে বুধবার সকাল হতে বিক্ষোভ শুরু করে। তারা পাশের ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবরোধ তৈরি করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে। আলোচনা শেষে শ্রমিকদের মার্চ মাসের বেতন ভাতা আগামী ১১ মে ঘোষণার আশ্বাস দিলে প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা পর দুপুর ২টার দিকে আন্দোলনরতরা সড়ক অবরোধ তুলে নিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
এদিকে শিল্প পুলিশের ইন্সপেক্টর রেজাউল করিম রেজা জানান, কালিয়াকৈরের মৌচাক সফিপুর এলাকার বে-ফুট কারখানার শ্রমিকরা চলতি মে মাসের ১৫দিনেরসহ এপ্রিল মাসের বেতন ও ঈদ বোনাসের দাবীতে বুধবার বেলা ১১টার দিকে কারখানার গেইটে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। বন্ধ ঘোষণা করা এ একারখানার ৩ সহস্রাধিক শ্রমিক রয়েছে। একপর্যায়ে তারা পার্শ্ববর্তী ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে শ্রমিক প্রতিনিধি ও কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে। আলোচনা শেষে শ্রমিকদের পাওনাদি আগামী  ৯মে পরিশোধের আশ্বাস দিলে প্রায় আধাঘন্টা পর শ্রমিকরা মহাসড়কের অবরোধ তুলে নিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

অপর দিকে শিল্প পুলিশের ইন্সপেক্টর শহীদুল ইসলাম জানান, আংশিক শ্রমিক দিয়ে স্বল্পপরিসরে কাজ করানোর পরিবর্তে কারখানার সকল শ্রমিককে কাজে নিয়োগ করার দাবীতে বুধবার সকালে মহানগরীর লক্ষ্মীপুরা এলাকার মোহাম্মদীয়া ও স্টাইল ক্র্যাফ্ট নামের দু’পোশাক কারখানার শ্রমিকরা পৃথকভাবে বিক্ষোভ করেছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2018 Dailykhaboreralo.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com