সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ০৫:০৫ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
মাধবপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শহীদ মিনার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান গাজীপুরে পোশাক নারী শ্রমিক গণধর্ষণের শিকার ত্রিশালে রাস্তার দূর্ভোগে লালপুর-কৈতরবাড়ী ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা হলে অপরাধীদের মধ্যে ভীতিও থাকবে: কাদের ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাহাড়পুর একিয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিনব কায়দায় রোগীর সাথে প্রতারণা নবাবগঞ্জে অজ্ঞাত পরিচয় নারীর লাশ উদ্ধার মাধবপুরে করোনার ভাইরাসের সুযোগে বালু খেকোদের রমরমা ব্যবসা নৌকায় ভোট দেয়ার অপরাধে বিএনপি দলগতভাবেই এইসব অপকর্ম করেছিল -তথ্যমন্ত্রী বড়াইগ্রামে জোর পুর্বক ঘরবাড়ি ভাংচুর করে রাস্তা নির্মাণ

পুলিশ ক্রসফায়ার: মোফাখখার, একরামুল, সিনহা—এরপর কে?

প্রতীকী ছবি

খবরের আলো :

সাইফুর রহমান :প্রতিনিধি.

আলোচিত–সমালোচিত ক্রসফায়ারের অধিকাংশ ঘটনাই কারও কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। অসংখ্য ক্রসফায়ারের ঘটনার মধ্যে ব্যাপক প্রশ্নের মুখে পড়া অন্তত তিনটি আলোচিত ঘটনা আমরা বিবেচনায় নিতে পারি। তাঁরা হলেন প্রবীণ বামপন্থী নেতা মোফাখখারুল ইসলাম চৌধুরী, টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হক এবং সর্বশেষ সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান। মোফাখখার ও একরামুল হত্যার ঘটনায় বিচার হয়নি। মেজর সিনহার ঘটনায় পরিস্থিতির চাপে অন্তত একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে।

মোফাখখার ছিলেন পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) একটি অংশের বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা। তাঁকে হত্যার পর প্রতিবাদ হয়েছিল। ২০০৫ সালে ওই ক্রসফায়ারের ঘটনায় প্রথম বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়ে র‌্যাব, যথারীতি তা ধামাচাপা পড়ে যায়।

আর মেজর সিনহাকে হত্যার পর সেখানকার পুলিশ যে গল্প সাজিয়েছে, তা প্রাথমিকভাবে ধোপে টেকেনি। এই হত্যার ঘটনায় সরকারের সব পক্ষই এখন অস্বস্তিতে, সম্মানজনক সমাধানের উপায় খোঁজা হচ্ছে।

সন্ত্রাসী বা খুনি, মাদক ব্যবসায়ী ও মানব পাচারকারী—এই তিনটি পরিচয় দিতে পারলেই ক্রসফায়ার যেন বৈধ, এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এসব পরিচয় দিয়ে অখ্যাত, কুখ্যাতদের যেমন হত্যা করা হচ্ছে, তেমনি বাদ পড়ছে না নিরীহ মানুষও। ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা বা ব্যবসায়িক বিরোধ মেটাতেও র‌্যাব–পুলিশকে ব্যবহার করা হচ্ছে। কাউকে ক্রসফায়ারে দেওয়া হচ্ছে, কাউকে ভয় দেখানো হচ্ছে ক্রসফায়ারে দেওয়ার। এরপর একেকটি মিথ্যা ও বানোয়াট গল্প সাজানো হচ্ছে।

মিথ্যা বারবার বলতে বলতে তা একসময় ‘সত্য’ হয়ে যায়। কিন্তু ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের গল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা দিন দিন কমছে। অমুক জঙ্গল, পাহাড় বা নদীর তীরে আসামিকে সঙ্গে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধার কিংবা আসামিকে গ্রেপ্তার করতে যাওয়া হয়েছিল। এরপর আসামির সহযোগীরা র‌্যাব বা পুলিশের ওপর গুলিবর্ষণ করে। এ সময় আত্মরক্ষার্থে পুলিশ বা র‌্যাব পাল্টা গুলি ছোড়ে। এ সময় আসামির সহযোগী গুলিবিদ্ধ হন, তাঁকে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

র‌্যাবের ‘ক্রসফায়ারে’ কথিত চরমপন্থী বলে পরিচয় দেওয়া প্রবীণ বামপন্থী নেতা মোফাখখারুল ইসলাম চৌধুরী নিহত হওয়ার পর যে প্রশ্ন সামনে এসেছিল, তা হলো—তাঁর অপরাধ কী?

ক্রসফায়ারের সময় একরামুল হক সংযুক্ত ছিলেন অন্য প্রান্তে থাকা স্ত্রী আয়েশা বেগমের মুঠোফোনের সঙ্গে। ২০১৮ সালের ২৬ মে হত্যাকাণ্ডটি ঘটার আগে-পরে র‌্যাব সদস্যদের আলাপচারিতা শোনা যায় ফোনে থেকে পাওয়া রেকর্ডে। ঘটনার পাঁচ দিন পর তাঁর স্ত্রী আয়েশা বেগম সংবাদ সম্মেলন করে অডিও রেকর্ড প্রকাশ করেছিলেন। তিনি উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ছিলেন, তিনবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। হত্যার তথ্যপ্রমাণ থাকলেও বিচার পায়নি একরামুলের পরিবার।

অথচ সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আইনের চোখে সকল নাগরিক সমান এবং প্রত্যেকে আইনের সমান সুযোগ পাবেন।’ অনুচ্ছেদ ৩১ অনুসারে, আইন অনুযায়ী এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।’ অনুচ্ছেদ ৩২ বলছে, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না। আর অনুচ্ছেদ ৩৫(৩) অনুযায়ী ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার লাভের অধিকারী হবেন।

‘ক্রসফায়ার যেন আইনের  প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে গেছে। এটা সংবিধান বা আইনের শাসন সমর্থন করে না। আইনের দর্শন হচ্ছে, অনেক অপরাধী ছাড়া পাক, কিন্তু একজন নিরপরাধী যেন শাস্তি না পায়। তা ছাড়া কারও ভুলের কারণে একটি জীবন চলে গেলে তা ফিরিয়ে দেওয়া যায় না।’

বড় অপরাধীদের অনেকেই কিন্তু মাফ পান রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমার সুযোগ নিয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে এমন অনেক দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে। ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি আসলাম ফকিরকে রাজনৈতিক বিবেচনায় ফাঁসির সাজা মওকুফ করেছিলেন রাষ্ট্রপতি। ২০১৭ সালে তিনি মুক্তি পান, তিন বছর পর আবারও আরেকটি হত্যা মামলার প্রধান আসামি তিনি।

এর আগে ২০০৪ সালে চারদলীয় জোট সরকারের উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদারের ভাতিজা সাব্বির আহম্মদ গামা খুন হন। ২০০৬ সালে ২১ জনকে ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। ২০১০ সালে রাষ্ট্রপতি সবার ফাঁসির সাজা মওকুফ করেন। আবার লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক নুরুল ইসলামের হত্যাকারী আওয়ামী লীগ নেতা আবু তাহেরের ছেলে বিপ্লবের সাজা মওকুফ করেছেন রাষ্ট্রপতি। এর আগে সুইডেন বিএনপির নেতা মহিউদ্দিন ঝিন্টুর ফাঁসি মওকুফ করে সমালোচনার মুখে পড়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। তার মানে হচ্ছে, বিচারিক প্রক্রিয়ায় ফাঁসি হলেও দল, প্রভাব বা পরিচয় দেখে মুক্তি দেওয়া হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে দুর্ধর্ষ কয়েকজন আসামিকে প্রচলিত আইনে বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে। যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, জি কে শামীম, মো. সাহেদ, আরিফ-সাবরিনা, শামীমা নূর পাপিয়া, সেলিম প্রধানের মতো প্রভাবশালী আসামিরা কিন্তু জেলে আছেন। আমিন হুদার মতো মাদকসম্রাট, রফিকুল আমীনের মতো বিত্তশালী প্রতারক, মাহবুবুল হক চিশতির মতো ব্যাংক ডাকাত, হল–মার্ক কেলেঙ্কারির হোতা আরিফ-জেসমিনের বিচার কিন্তু প্রচলিত আইনে হয়েছে বা হচ্ছে। তাঁদের বিচার যদি হতে পারে, তাহলে পাড়া-মহল্লার ছিঁচকে সন্ত্রাসী, খুনি বা মাদক কারবারিকে কেন বিচারের মুখোমুখি করা যাবে না। প্রতিটি উপজেলায় আদালত, থানা, আইনজীবী আছেন। তাই প্রত্যেককে বিচারের মুখোমুখি করার সুযোগ কিন্তু আছে।

এখন পরিস্থিতি এমন যে ক্রসফায়ার ছাড়া যেন অপরাধ দমনের বিকল্প উপায় নেই। প্রকৃতপক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তারই ধারাবাহিকতায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদ খান হত্যার শিকার হলেন। সিনহার বদলে রাম, শ্যাম, যদু ,  একইভাবে হত্যার শিকার হতেন, তাহলে ঘটনাটি আড়ালেই থেকে যেত।

তবে এভাবে সংবিধান ও আইন পদদলিত, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচারের পথ রুদ্ধ করে এবং ব্যক্তিবিশেষকে আইন হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ দিয়ে লাভটা কার হচ্ছে—এটি ভেবে দেখার এখনই সময়। রাষ্ট্র ও সরকারের কাজ অপরাধীর বিচার করা, বিচারবহির্ভূত যেকোনো কাজ বন্ধ করা এবং কেউ তা করতে চাইলে তার লাগাম টেনে ধরা। তা ছাড়া এ ধরনের বিচারের জন্য দ্রুত বিচার আইন তো আছেই। ৬০ দিনের মধ্যে সেই আইনে বিচার করার সুযোগ আছে। তাহলে এক দিনের মধ্যে ক্রসফায়ারে এমন বর্বরতা চালাতে হবে কেন?

 

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2018 Dailykhaboreralo.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com