বুধবার, ১২ মে ২০২১, ১১:৪৭ অপরাহ্ন

দুর্নীতির বরপুত্র রাজউকের অথরাইজড অফিসার মাকিদ এহসানের রমরমা নোটিশ বাণিজ্য মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে জোন- ৩ এর অতিরিক্ত দায়িত্বে 

খবরের আলো :
স্টাফ রিপোর্টার :
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এর মহাখালী জোনাল অফিসের ৪ নাম্বার জোনের অথরাইজড অফিসার   ইঞ্জিনিয়ার মাকিদ এহসানের বিরুদ্ধে  ৩ নম্বর জোনের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা নকশা বহির্ভূত  ও নকশাহীন ভবনের বিরুদ্ধে নোটিশের ভয়ভীতি দেখিয়ে রমরমা বাণিজ্য করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বানিজ্য করে তিনি রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন। বর্তমানে তিনি মোটা অংকের টাকা ঘুষ দিয়ে তিন নম্বর জোনের অতিরিক্ত দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। এর আগেও তিনি তিন নম্বর জোনে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেই সময়ে তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় কর্তৃপক্ষ তাকে অন্যত্র বদলি করে ।
রাজধানীর পল্লবীর ইষ্টার্ণ হাউজিং আবাসিক এলাকায় একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই এলাকায়  অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে অসংখ্য নকশা বহির্ভূত ভবন। এসব অবৈধ নকশা বহির্ভূত ভবনের মালিকদের কাছ থেকে অথরাইজড অফিসার মাকিদ এহসান মোটা অংকের টাকা নিয়ে তাদেরকে সহযোগীতা করেন। যারা তাকে টাকা না দেয় তাদের বিরুদ্ধে তিনি নোটিশ করেন।  এ নোটিশ করার পর যারা তাকে টাকা দেয় তাদের বিরুদ্ধে তিনি আর কিছুই করেন না।
তারা আরো বলেন, তিনি তার পছন্দমতো ইমারত পরিদর্শকদেরকে দিয়ে ভবন মালিকদেরকে তার দপ্তরে ডেকে আনেন। ডেকে আনার পর  সহকারি অথরাইজড অফিসার রঙ্গন মন্ডলের মাধ্যমে তিনি টাকার বিষয়ে সুরাহা করে থাকেন। রঞ্জন মন্ডল অথরাইজড অফিসারের আইডি ব্যবহার করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায,  ইষ্টার্ন হাউজিংয়ে এরকম অসংখ্য ভবন রয়েছে যাদের বিরুদ্ধে নোটিশ করা হয়েছে। নোটিশ করার পরও সেসব ভবন আগের মত অবৈধভাবে নির্মান করা হয়েছে। কিছুদিন আগে ওই এলাকায় কয়েকটি ভবনের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। সেসব ভবনও আগের মতই অবৈধভাবে  নির্মান করা হয়েছে।
পল্লবীব আলুব্দী এলাকা সংলগ্ন ইষ্টার্ণ হাউজিংয়ের এন ব্লক, ২/৩ নম্বর রোডের ২ নম্বর প্লটে একটি সাড়ে দশতলা ভবনের নির্মানকাজ চলছে। যে ভবনটির বিরুদ্ধে রাজউক অনুমোদিত নকশা বহির্ভূতভাবে নির্মান করাসহ ইষ্টার্ন হাউজিংয়ের মূল মাষ্টারপ্ল্যানে দৃশ্যমান ৪০ ফিট রাস্তার প্রায় ১৫ ফিট দখল করে নির্মান করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভবনের সামনে রাজউক অনুমোদিত তথ্য সম্বলিত সাইনবোর্ড ও শ্রমিক কিংবা জনসাধারণের নিরাপত্তার জন্য কোন সেফটিনেট নেই।
ভবনটি সম্পর্কে রাজউকের মহাখালী জোনাল অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভবনটির   নকশা অনুমোদন ও ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রে রয়েছে চরম অসংগতি। এ ব্যপারে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র শাখার উপ-নগর পরিকল্পনাবিদ কামরুল হাসান সোহাগের নিকট তথ্য অধিকার আইন- ২০০৯ অনুযায়ী তথ্য চাওয়া হলে তিনি তথ্য দিতে অস্বীকার করেন। ইতোমধ্যে রাজউকের দু’জন ইমারত পরিদর্শক ওই ভবনটিতে বেশ কয়েকবার পরিদর্শন করেছে। তারা বলেছে, ভবনটি নকশা বহির্ভূতভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছে।
ওই ভবনটির সার্বক্ষনিক নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা মোঃ রজ্জব আলী বলেন, এ ভবনটির মোট মালিক ৩০ জন। ভবনটির নির্মানের দায়িত্বে আছেন মোঃ সাইফুল ইসলাম নিজাম।
পবর্তীতে সাইফুল ইসলাম নিজামের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, এ ভবনের নির্মাণকাজ রাজউকের নিয়মানুযায়ী করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট জোনের ইমারত পরিদর্শক মোঃ জিল্লুর রহমান বলেন, এ ভবনটিতে আমি বেশ কয়েকবার পরিদর্শন করেছি। ভবন মালিকদের কাছে অনুমোদিত নকশা চাওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত ভবন মালিক তা সরবরাহ করেননি। তাই ওই ভবনসহ আরো বেশ কয়েকটি ভবনের বিরুদ্ধে নোটিশ রেডি করা হয়েছে। স্যারের সই হলেই সেগুলো প্রেরন করা হবে।
ইষ্টার্ন হাউজিংয়ের এইচ  ব্লকের ৬ নম্বর রোডের ৬ নম্বর প্লটে একটি ভবনের নির্মানকাজ ইতোমধ্যে সাড়ে ছয়তলা পর্যন্ত সম্পুর্ন হয়েছে। ভবনটির নির্মান কাজের মাঝামাঝি সময়ে রাজউকের ইমারত পরিদর্শক মোঃ জিল্লুর রহমান ওই ভবনটিতে একাধিকবার  পরিদর্শন করেছে। ভবনটি চারতলার অনুমোদন নিয়ে ছয়তলা নির্মান করা হয়েছে। ভবনটির নির্মানকাজের দেখভালের দায়িত্বে আছেন রোকন নামের এক ব্যক্তি। তিনি রাজউক অফিসে যোগাযোগ করে। শোনা যায়, এ ভবনটির মালিক অথরাইজড অফিসারকে তিন  লক্ষ টাকা দিয়েছ। একই রোডে ৮ নম্বর এবং ২৫ প্লটে অবস্থিত দুটি  ভবন একইভাবে নির্মান করা হচ্ছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, জে ব্লকের এনএস- ২ নম্বর রোডের ১১ নং প্লটের ভবনের মালিক আলী নূর, ছামছুল আলম, শাহানাজ বেগম ও হেলাল উদ্দিন। এই ভবনটি রাজউক থেকে অনুমোদন নিয়েছে চারতলার কিন্তু নির্মাণ করেছে ছয়তলা। এই ভবনের মালিকরা রাজউকের  একজন সহকারী অথরাইজড অফিসারের মাধ্যমে অথরাইজড অফিসারদের ম্যানেজ করেছে।  এফ ব্লক ২ নম্বর রোডের ৪ নম্বর প্লটের মালিক মোঃ হায়দার আলী ও  মেইন রোডের ১০ ও ১৫ নম্বর ভবনের মালিকরা একইভাবে তাদের ভবন নির্মাণ করছেন।
ওই এলাকার একজন কন্ট্রাক্টর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হয়ে বলেন, ইষ্টার্ন হাউজিংয়ে চারতলার অনুমোদন নিয়ে ছয়তলা, সাড়ে ছয়তলা করেছে এরকম অসংখ্য ভবন আছে। যেসব ভবনের মালিকরা রাজউকের ইমারত পরিদর্শকের মাধ্যমে অথরাইজড অফিসারকে   মোটা অংকের টাকা মাসোয়ারা দেয়। তাই তারা এসব ভবনের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে চায় না। যদি কেউ কোন ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলে তখন তারা নেই নিচ্ছি করে কালক্ষেপন করে। এর মধ্যে ভবনের  নির্মানকাজ শেষ হয়ে যায়। তখন তারাই ভবন মালিককে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেয়। এরপর সেই মামলার দোহাই দিয়ে রাজউক কিংবা অন্য কোন সংস্থা সেই ভবনের বিরুদ্ধে আর কোন ব্যবস্থা নেয় না। রাজউকের ইমারত পরিদর্শকদের বিরুদ্ধে এরকম অভিযোগ অনেক আছে।
ওই এলাকার এক ডেভেলপার কোম্পানীর মালিক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হয়ে বলেন, এই এলাকায় অসংখ্য ভবন আছে যেগুলোর অনুমোদন রয়েছে চারতলার কিন্তু নির্মাণ করেছে ছয়তলা, সাততলা। সবাই রাজউকের ইমারত পরিদর্শক ও  অথরাইজড অফিসারকে  মোটা অংকের টাকা দিয়েছে।
এসব ভবনের নির্মানকারীরা বলেন, এত টাকা দিয়ে জমি কিনে চারতলা পর্যন্ত বাড়ি নির্মান করলে কিভাবে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করব। ডেভেলপার কোম্পানীর মালিকরা বলেন, এভাবে চারতলা ভবন নির্মাণ করলে ব্যবসা করা যাবে না। রাজউকের নিয়মানুযায়ী ভবন নির্মান করে ব্যবসা করতে গেলে পথে বসতে হবে। তাই আমরা বেসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষের রাডার অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া কিংবা আরো উচুতে বসানোর জন্য দাবী জানাচ্ছি।
এই ব্যপারে এ জোনের ভারপ্রাপ্ত অথরাইজড অফিসার ইঞ্জিনিয়ার মাকিদ এহসান বলেন, আমি নিয়মানুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি। আমার কিছু সহকর্মীরা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। সেসব  ভবনের বিরুদ্ধে অতি দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ইমারত পরিদর্শক জিল্লুর রহমান বলেন, ওই এলাকায় একাধিক ভবনের বিরুদ্ধে নোটিশ রেডি করা হয়েছে। স্যারের সই হলেই সেসব সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রেরন করা হবে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2018 Dailykhaboreralo.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com