বৃহস্পতিবার, ১৩ মে ২০২১, ১২:৩০ পূর্বাহ্ন

আ.লীগ নেতার বাড়িতে ব্যবসায়ীর লাশ, এসপি অফিস ঘেরাও

ব্যবসায়ী হাসান আলী হত্যার প্রতিবাদে গাইবান্ধা জেলা শহর উত্তাল হয়ে উঠেছে। শনিবার সকালে জেলা আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক চিহ্নিত দাদন ব্যবসায়ী মাসুদ রানার বাড়ি থেকে হাসান আলীর লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনার বিচার দাবিতে এসপির অফিস ঘেরাও করেন বিক্ষুব্ধ মানুষ।

সুদের কিস্তির টাকা পরিশোধে বিলম্ব হওয়ার কারণে দাদন ব্যবসায়ী মাসুদ রানা গত ৬ মার্চ হাসান আলীকে বাড়ি ডেকে নিয়ে এসে মাসুদ রানার বাড়িতে আটক করে রেখে তাকে নির্যাতন চালিয়ে নিমর্মভাবে হত্যা করে। ওই ঘটনায় পুলিশ মাসুদ রানাকে আটক করে।

এদিকে পুলিশ প্রথমে এই হত্যাকাণ্ডকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা নেয়। কিন্তু জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে পরে তিনজনকে আসামি করে গত রোববার রাতে একটি মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু পুলিশদের কাউকে আসামি না করায় শহরবাসী বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে।

সোমবার গাইবান্ধা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের উদ্যোগে শহরের ডিবি রোড আসাদুজ্জামান মার্কেটের সামনে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ এবং মুল আসামি ও মদদদাতাদের গ্রেফতারের দাবিতে এক মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচীতে জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী, সামাজিক-সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া সংগঠন, সাংবাদিক ও বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ এবং নিহত হাসান আলীর স্ত্রী বিথি বেগম, ছোট ছেলে হেদায়েতুল ইসলাম শাফিন প্রমুখ অংশ নেন।

জেলা শহরের সকল ওষুধের দোকানসহ মার্কেট-শপিংমল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে সকল ব্যবসায়ীরা এ কর্মসূচিতে অংশ নেন।

চেম্বার সভাপতি শহিদুল ইসলাম শান্তর সভাপতিত্বে এসময় বিক্ষোভ সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন- ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় পলিট ব্যুরো সদস্য আমিনুল ইসলাম গোলাপ, জেলা জাসদের সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহ শরিফুল ইসলাম বাবলু, গণফোরাম নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা ময়নুল ইসলাম রাজা, কমিউনিস্ট পার্টির জেলা সভাপতি মিহির ঘোষ, জেলা জাসদ সভাপতি গোলাম মারুফ মনা, সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল হক জনি, জেলা বাসদের মনজুর আলম মিঠু, কাজী আবু রাহেন শফিউল্যাহ খোকন, গোলাম রব্বানী, জেলা যুবলীগ সভাপতি সরদার মো. শাহীদ হাসান লোটন, গাইবান্ধা চেম্বারের সহ-সভাপতি মোস্তাক আহমেদ রঞ্জু, ওষুধ ব্যবসায়ী সমিতির জেলা সভাপতি আব্দুর রশিদ সরকার, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের জেলা সভাপতি রেজাউন্নবী রাজু, গাইবান্ধা নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংস্থার সাধারণ সম্পাদক দেবাশিষ দাশ দিপু, জেলা ব্যবসায়ী সমন্বয় সমিতির সভাপতি ইকবাল আহমেদ, মাইক ব্যবসায়ী সমিতির জেলা সাধারণ সম্পাদক জুয়েল মিয়া, পাদুকা ব্যবসায়ী সমিতির জেলা সভাপতি আলিম মিয়া, জেলা দোকান শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক চঞ্চল সাহা, সাবেক ছাত্রনেতা আরিফুল ইসলাম চৌধুরী শাহীন প্রমুখ।

মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সদর থানার ওসি মাহফুজুর রহমানকে অপসারণ ও গ্রেফতার, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের শাস্তি এবং বিচার বিভাগীয় গঠনসহ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানানো হয়। দাবি আদায় না হলে জেলায় সর্বাত্মক হরতালের হুঁশিয়ারি দেন বক্তারা।

মানববন্ধন ও সমাবেশ শেষে বিক্ষুব্ধ সর্বস্তরের লোকজন মিছিল নিয়ে পুলিশ সুপার অফিস ঘেরাও করে। পরে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম এক বৈঠকে বসেন। ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের দাবিসমূহ বাস্তবায়নের আহবান জানান। অন্যথায় হরতালসহ লাগাতার নানা কর্মসূচী পালন করা হবে বলে আল্টিমেটাম দেন।

পুলিশ সুপার তাদের বক্তব্য ধৈর্য সহকারে শোনেন এবং তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস দেন। এসময় পুলিশ সুপার নিহত হাসান আলীর ছেলে হেদায়েতুল ইসলাম শাফিনের লেখাপড়ার দায়িত্ব নেয়ার ঘোষণা দেন।

উল্লেখ্য, এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গাইবান্ধা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই তদন্ত কমিটিতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) রাহাত গাওহারীকে আহ্বায়ক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হেড কোয়ার্টার) আবুল খায়ের ও পুলিশ পরিদর্শক মো. আব্দুল লতিফকে সদস্য করা হয়েছে।

এদিকে হাসান আলী নিহতের ঘটনায় দাদন ব্যবসায়ী আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ রানাসহ ডেভিড কোম্পানি পাড়ার মৃত সিরাজ মিয়ার ছেলে রুমেল হক ও মৃত হবিবর রহমানের ছেলে খলিলুর রহমান বাবুকে আসামি করে নিহত হাসান আলীর স্ত্রী বিথি বেগম থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশকে বাদ দিয়ে এ মামলা দায়েরের ঘটনায় শহরে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে আওয়ামী লীগ নেতা ও দাদন ব্যবসায়ী আসামি মাসুদ রানাকে সদর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলে অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. নজরুল ইসলামের কাছে আবেদন করলে তিনি চারদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

উল্লেখ্য, গাইবান্ধা জেলা শহরের খানকা শরীফ সংলগ্ন নারায়ণপুর এলাকার বাসিন্দা জেলা আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক এলাকার চিহ্নিত দাদন ব্যবসায়ী মাসুদ রানার বাড়ির একটি ঘর থেকে শনিবার সকালে ব্যবসায়ী হাসান আলীর (৪৫) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত হাসান আলী শহরের থানাপাড়া এলাকার মৃত হজরত আলীর ছেলে।

গাইবান্ধা সদর থানার ওসি মো. মাহফুজুর রহমান এই হত্যাকাণ্ডকে আত্মহত্যা বলে সাংবাদিকদের জানালে এলাকাবাসী বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পরে শহরে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন পালন করে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2018 Dailykhaboreralo.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com