দৈনিক দেশের শিল্প, বাণিজ্য, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান নিম্নগামী থেকে ঊর্ধ্বগামী করতে হলে যাহা করতে হবে- কয়েকটি প্রস্তাব দেয়া হলো

আমাদের দেশে মন্ত্রী বানানো হয় কামারকে কুমারের দায়িত্ব দিয়ে। যে কাজের দায়িত্ব তাদের দেয়া হয় সেই দায়িত্ব সম্পর্কে তাদের কোন অভিজ্ঞতাই থাকে না। সে জনাই দেশের শিল্প, বাণিজ্য, অর্থনীতি উন্নতি না হয়ে অবনতি হতে থাকে। দেশ স্বাধীন হয়েছে প্রায় ৫৪ বৎসর, এ চুয়ান্ন বৎসরে দুইটি স্বৈরশাসক দেশ শাসন করেছে, জাতীয় পার্টি নয় বৎসর, আওয়ামী লীগ ২০ বৎসর, বিএনপি জিয়াউর রহমানসহ ১৭ বৎসর। রাকি সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং অন্তবর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করে থাকেন। কোন সরকারের আমলে কে কেমন উন্নতি করেছে তা অনেকেই জানেন না বলেই নিম্নে উল্লেখ করা হলো।

প্রথমত শেখ মুজিবের শাসন থেকে ধরে শেখ হাছিনাসহ ২০ বৎসর তারা দেশে শুধু বিরোধীদল দমন নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। কীভাবে নিজেদের ক্ষমতা চিরকাল ধরে রাখা যায় এ নিয়ে চলে ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত। একে একে ৩ বারে ১৮ কোটি মানুষের ভোটের অধিকার হরণ করেন। তারা সংসদ ভবনকে করেছে নর্তকিদের গানের। আসর। দুই স্বৈরশাসক এক দেশে দুই প্রকার আমদানি রপ্তানি নীতি করে থাকেন। এ কারণে দেশের স্থানায় ব্যবহৃত বস্ত্রশিল্পের ধ্বস নেমেছে। রপ্তানিকারক শিল্পের জন্য আমদানি করলে ট্যাক্স দিতে লাগে না। স্থানীয় বস্ত্রশিল্পের জন্য আমদানি করলে ট্যাক্স লাগে। এ সুযোগ নিয়ে ট্যাক্সবিহীন বস্ত্র আমদানি করে গার্মেন্টসগুলো লোকাল বাজারে বিক্রি করে দিয়ে দেশের লোকাল বস্ত্রশিল্প ধ্বংস করেছেন। এজন্যই দেশের শিল্প-বাণিজ্য অগ্রগতি না হয়ে নিম্নগতির দিকে ধাবিত হয়েছে। বিগত সরকার করেছে যাতায়াতের জন্য রাস্তাঘাট, ওভারব্রিজ, নদীর উপরে কয়েকটি বড় বড় সেতু, মেট্রোরেল এবং কয়েকটি সিমেন্টের ফ্যাক্টরী। এছাড়া তারা উন্নয়ন করেছে গুম, খুন, দুর্নীতি বিরোধী দলকে জুলুম অত্যাচার করে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে ভরে। যে কাজগুলি তারা করেছে সেগুলি হলো তাদের বাণিজ্যের স্বার্থে করেছে। উন্নত বিশ্বের কোথাও এত খরচ পড়ে না, তারা নিজের দলের লোক ছাড়া বিরোধীদলের কাউকে কাজ করতে দিতো না। বিএনপির তৈরি অর্থনীতি উন্নয়নের পথ সৃষ্টি করে রাখা আয়কে ব্যবহার করে একগুঁয়েমি করে ক্ষমতা অপব্যবহার করেছে।

স্বৈরশাসক জাতীয় পার্টি শেখ হাসিনার মতোই গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করে নিজেরা একক ক্ষমতায় দেশ শাসন করেছে। উভয় স্বৈরশাসকই এক দল আরেক দলের সহযোগিতায় জড়িত ছিলেন শেখ হাসিনার

Reference

একজন পিয়ন চারশত কোটি টাকার মালিক হয়েছে। বিগত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে গর্ব করে বলেন-আমার একজন পিয়ন সেও ৪০০ শত কোটি টাকার মালিক।

জিয়াউর রহমানের আমল থেকে মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া সরকারের সময় দেশে প্রায় ৫ হাজারেরও উলে পার্মেন্টস তৈরি হয়েছে। ৮ হাজারেরও বেশি বস্ত্র শিল্পসহ বিভিন্ন প্রকার শিল্প দেশে তৈরি হয়েছে কম হলেও দেশে ৫-৮ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এছাড়াও দেশের কৃষকদের উন্নতির জন্য দেশে হাজার হাজার খাল খনন করে কৃষকের জমিতে পানি দেয়ার কারণে কৃষকের ঘরে ধান দিয়ে গোলা ভরার ব্যবস্থা হয়েছে।।। খাদ্য আমদানী করলে সরকারের ফান্ডে টাকা থাকতো না। বিদেশ থেকে ঋণ করে দেশের রাস্তাঘাট উন্নয়ন করতে হতো। বিদেশ থেকে যেন ভিক্ষা এবং ঋণ না করতে হয় সে জন্য চালু করলেন ভ্যাট, ট্যাক্স পদ্ধতি। প্রতি বৎসর যেই ভ্যাট, ট্যাক্স পান সেই টাকা দিয়েই দেশের যত প্রকারের রাস্তাঘাট এবং শিক্ষা ব্যবস্থা, ব্রীজ, ওভারব্রিজ, মেট্রো গাড়ী, যোগাযোগ সমস্ত কিছুই ভ্যাট, ট্যাক্সের টাকা দিয়েই ব্যয় বহন করে থাকেন।।

বিএনপি’র আমলে তারা দেশের শিল্প বাণিজ্যের উন্নতি কীভাবে করা যায় এবং শিল্প বাণিজ্যের বাধা-বিপত্তি সমাধানের জন্য বিএনপি সরকার দেশের বহু দলীয় উন্নয়ন কমিটি বানিয়ে ছিলেন। সেই উন্নয়ন কমিটির কাজ ছিল্যে প্রতি মাসে বিভিন্ন প্রকারের শিল্পপতিদের এবং আমদানি রপ্তানিকারকদের, ব্যাংক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, এমডিদের এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী সমিতির কর্মকর্তাদের ডেকে মত বিনিময় মিটিং করে শিল্প বাণিজ্যের বাধা, বিপত্তির সমাধান করতেন। সেই মত-বিনিময় সভায় শিল্পমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, বজ্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকতেন। প্রায় বিভিন্ন ক্যাটাগরির প্রায় ২-৩ শত মানুষ তাদের সমস্যগুলি তুলে ধরতেন, যার যার মত প্রকাশ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন বলেই বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করে দিতেন। এজন্যই দেশের শিল্প-বাণিজ্যের উন্নতি সাধন হয়েছিলো। বিগত স্বৈরশাসক ভুলেও মতবিনিময় সভার সুযোগ করে দেন নাই। তারা তাদের একগুঁয়েমী করে শিল্প-বাণিজ্যের নিয়মনীতি তৈরি করেছিলো। তারা দেশের উন্নয়নে কোন কাজ করেন নাই। তাদের উছিলায় মাত্র কয়েকটি সিমেন্টের ফ্যাক্টরী ছাড়া কোন শিল্প তৈরি হয় নাই। বিএনপির উন্নয়নের অর্থ ব্যবহার করেছেন বিগত দুই স্বৈরশাসক। সব দেশেই দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। রাতারাতি অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিপ্লব ঘটে থাকে। আর আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫৪ বৎসর হলো। ২৯ বৎসর দুই স্বৈরশাসক ২ শত বৎসর দেশকে পিছিয়ে দিয়েছে। এখন আর পেছনে তাকানোর সময় নাই। দেশের শিল্প বাণিজ্যের উন্নতি সাধন করতে হলে নিম্নের লেখা অনুযায়ীই এগিয়ে নিতে হবে। যা সমাধান করতে হবে তা উল্লেখ করা হলো-

প্রথমত অধিকাংশ শিল্প উদ্যোক্তা সে নিজেই তার শিল্প ভবিষ্যতের জন্য স্থায়িত্ব চান না। প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরির সময় দুই থেকে তিন গুণ শিল্প ভেল্যু বাড়িয়ে প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি করে ব্যাংকে জমা দিয়ে থাকেন। ব্যাংক কর্মকর্তাগণ তাদের চাহিদা অনুযায়ী ঘুষের টাকা পেয়ে প্রজেক্ট লোন পাস করিয়েছেন। যে উদ্যোক্তা তাদের চাহিদা অনুযায়ী ঘুষ দিবে না তার প্রজেক্ট লোন জীবনেও পাস হবে না। উদ্যোক্তা জমির ভেলা, কনস্ট্রাকশন ভেল্যু, মেশিনের ভেল্যু, বিভিন্ন কিছুর উপরে ভেল্যু বাড়িয়ে ১ টাকার জায়গায় ৩ টাকা বাড়িয়ে শিল্পপতি বনে যান বলেই শিল্পের উপরে তিনগুণ সুদ বেশি পড়ে যায়। ফলে ব্যাংকের মূল টাকা আর ফেরত দিতে পারেন না। প্রতি বৎসর যে সুদ আসে ঐ সুদের টাকা দিতেই হিমসিম খেতে হয়। ব্যাংকের চুক্তিমতো ঋণের মূল টাকা ফেরত না দিতে পারায় ব্যাংক কর্মকর্তাদেরকেও উৎকোচ দিতে হয়, এভাবেই শিল্প রুগ্ন হয়ে মৃত হয়ে যায়।

১. বর্তমান সরকারের উচিত হবে পূর্বে যারা ব্যাংক থেকে ভেল্যু বাড়িয়ে টাকা নিয়ে শিল্প তৈরি করে চুক্তি মোতাবেক মূল টাকা ফেরত দিতে পারেন নাই। তাদের শিল্প প্রোফাইল বরাবর প্রজেক্ট আছে কিনা যাচাই-

বাছাই করার জন্য সৎ চরিত্রের মানুষ দ্বারা তদন্ত কমিটি তৈরি করে ভেল্যু কম পেলে উদ্যোক্তার স্থাবর অস্থাবর সম্পদ বিক্রি করে ব্যাংকে জমা করে নিতে হবে। এরপরে অন্যত্র শিল্প বিক্রি করে দিতে হবে।

২. সরকার যে দল থেকেই আসবে তাদের সচেতন হতে হবে। পেছনে যেইভাবে ভেল্যু বৃদ্ধি করে প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি করে ২-৩ গুণ বাড়িয়ে প্রজেক্ট লোন নিয়ে শিল্পকে রুগ্ন বানিয়ে টাকা ফেরত দিতে পারেন নাই, সে রকম যেন আর না হয় সে ব্যবস্থা নিতে হবে।

৩. শিল্পের গ্যাস বিল, বিদ্যুৎ বিল সহনীয়ভাবে নিতে হবে।

৪. শিল্পের উৎপাদিত পণ্যের আমদানি এবং রপ্তানির উপর ট্যাক্স, ভ্যাট সহনশীলভাবে কমাতে হবে।

৫. দেশের স্থানীয়ভাবে নিজ দেশের মানুষের ব্যবহারসামগ্রি তৈরি করার জন্য কাঁচামাল আমদানির উপর ট্যাক্স, ভ্যাট রপ্তানি শিল্পের বরাবরে করতে হবে। দেশের সব শিল্পের সুযোগ-সুবিধা একইভাবে দেখতে হবে। স্থানীয় ব্যবহারিক বস্ত্রশিল্পে কাঁচামাল আমদানিতে ট্যাক্স, ভ্যাট ধরলে রপ্তানি শিল্পের জন্য ট্যাক্স, ভ্যাটবিহীন আমদানি নীতি হলে, স্থানীয় উৎপাদিত বস্ত্রের মূল্য বেশি হলে গার্মেন্টস শিল্পের বস্ত্র স্থানীয় মার্কেটে বিক্রি করে দিলে স্থানীয় ব্যবহৃত বস্ত্রশিল্প বন্ধ হয়ে যাবে। বিগত দুই স্বৈরাচার শাসকের আমলে এক দেশে দুই প্রকার আমদানি নীতির দরুণ স্থানীয় ব্যবহারিক উৎপাদন শিল্প ৫০% বন্ধ হয়ে গিয়েছে। যে সরকারই আসবে তাদের শিল্পের কাঁচামাল এবং মেশিন, মেশিনের পার্স সকল আমদানি ট্যাক্স, ভ্যাট একই হতে হবে। রপ্তানি শিল্পের মাধ্যমে ট্যাক্স, ভ্যাট ফ্রি এনে দেশের লোকাল বাজার ছয়লাব করে দিয়ে স্থানীয় বস্ত্রশিল্প ধ্বংস করে দিবে। এ বিষয়ে সরকারকে সচেতন হতে হবে।

৭. সরকার গঠনের সাথে সাথেই বহুদলীয় শিল্প বাণিজ্য উন্নয়ন কমিটি বানাতে হবে। সে উন্নয়ন কমিটিতে সদস্য বানাতে হবে। দেশে যতগুলি দল আছে তা থেকে কমপক্ষে একশত সদস্য বানাতে হবে। এদের কাজ হবে প্রতি মাসে একদিন নির্দিষ্ট দিনে বৎসরে বারটি মতবিনিময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। সে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে সবাই উপস্থিত থাকতে হবে। শিল্পমন্ত্রী, বস্ত্রমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী তারা উপস্থিত থাকলে অনেক ভালো হবে। না থাকতে পারলে প্রতিমন্ত্রীদের অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে। এদের সাথে থাকতে হবে ব্যাংকের চেয়ারম্যান অথবা এমডি এবং আমদানী রপ্তানী ব্যুরোর কর্মকর্তাদের থেকে ২ জন, শিল্প বাণিজ্যের মধ্যে যারা আছেন তাদেরসহ শিল্পপতিদেরও থাকতে হবে। আমদানি রপ্তানি ব্যবসায় জড়িতদেরও থাকতে হবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে শিল্প বাণিজ্যে কোন বাধা বিপত্তি থাকলে যার যার মত প্রকাশ করার সুযোগ দিতে হবে। তাহলে শিল্প বাণিজ্যে যত প্রকার সমস্যা আছে সে জটলা খুলে যাবে। বিশেষ করে যার যার এলাকার সংসদ সদস্যগণ জ্ঞানী ও গুণীজনদেরকে নিয়ে প্রতি মাসে একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করতে হবে। তাহলে যার যার এলাকার সমস্যাগুলো উঠে আসবে এবং সমাধান করা সহজ হবে। সরকার যদি এ মতবিনিময় সভা করার সুযোগ করে দেন তবে দেশ অর্থনীতির উপর স্বর্গরাজ হয়ে রাতারাতি উন্নত বিশ্বের মতো স্বনির্ভর হয়ে যাবে। আর যদি নিজেদের ইচ্ছেমত একগুঁয়েমি করে দেশ চালাতে চান তাহলে দেশের উন্নতি গুড়েবালি হয়ে যাবে।

মন্তব্য করুন