১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি আটকে দিতে পারে বাণিজ্য বিধিনিষেধ

ছবি সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক

কভিড মহামারীজনিত অর্থনীতি স্থবিরতার মুখে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদহার, ভোক্তা ব্যয় পতন ও সরকারি ঋণের বোঝা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ধরনের সংকট দেখেছে বিশ্ব। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন মাত্রা হিসেবে যুক্ত হয়েছে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বাণিজ্য সুরক্ষানীতি। দুই ক্ষেত্রে দেশগুলো একক বা জোটবদ্ধভাবে বাণিজ্যে বিধিনিষেধ আরোপ করছে, যেখানে প্রধান বাধা হিসেবে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শুল্ক আরোপ। গত কয়েক মাসে এ ধরনের একাধিক ঘটনা দেখা গেছে। আগামী মাস অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মার্কিন নির্বাচন ঘিরেও একই ধরনের উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। বিষয়গুলো এরই মধ্যে একাধিক ফোরামে আলোচিত হয়েছে।

বাণিজ্য বাধা ও বিধিনিষেধ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আটকে রাখে’ বলে সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের (ইসিবি) প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্ড। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক গীতা গোপীনাথ জানান, বিধিনিষেধের কারণে বিশ্ব হারাতে পারে ৭ শতাংশ জিডিপি।

যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য পুনর্নির্বাচন ঘিরে উদ্বেগ বেড়ে যাওয়ার সময় এসব মন্তব্য এল। সাবেক এ মার্কিন প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি জানিয়েছেন, তিনি নির্বাচিত হলে সব ধরনের আমদানির ওপর ২০ শতাংশ পর্যন্ত সর্বজনীন কর বা শুল্ক প্রবর্তনের পরিকল্পনা করছেন। এর বিপরীতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিশোধ নেয়ার পরিকল্পনা করছে বলেও জানা গেছে।

গত সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘অভিধানে থাকা সবচেয়ে সুন্দর শব্দ হলো শুল্ক’। বিশ্ব বাজার ও বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রীরা রিপাবলিকান প্রার্থীর প্রতিশ্রুতিগুলো কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব সহকারে নিতে শুরু করেছেন।

আনাদোলুর প্রতিবেদন অনুসারে, আটলান্টিক কাউন্সিল আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বুধবার ইসিবিপ্রধান ক্রিস্টিন ল্যাগার্ড কিছু উদ্বেগ তুলে ধরেন। তিনি জানান, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী নেতৃত্বের সম্পর্ক রয়েছে। যখন দেশটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অন্যদের সঙ্গে সমন্বয়ে জোর দেয়, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও সারা বিশ্ব উপকৃত হয়।

ক্রিস্টিন লাগার্ড বলেন, ‘আমরা এমন কোনো বিশ্বে নেই, যেখানে বাণিজ্য প্রয়োজন নেই বা হ্রাস পাচ্ছে। এর পরিবর্তে বাণিজ্য চলমান কিন্তু পরিবর্তনশীল। আমরা কার সঙ্গে বাণিজ্য করছি এবং কীভাবে আমরা ঝুঁকি নিচ্ছি, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। বাণিজ্যের এ চলমান প্রবণতায় বিভিন্ন অংশীদারদের সংযোগ ঘটে এবং নতুন উপায়ে ঘটছে।’

বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি (ইভি) খাতে এক দশকে শীর্ষ দেশ হিসেবে উঠে এসেছে চীন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ একাধিক অঞ্চল থেকে এ খাতে দেশটি বিধিনিষেধের মুখে পড়েছে সাম্প্রতিক মাসগুলোয়। যুক্তরাষ্ট্রে শতভাগ ও ইউরোপে ৪৮ শতাংশ পযন্ত শুল্ক আরোপ হয়েছে চীনা ইভির ওপর। পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে বেইজিংও বসে নেই। একাধিক পণ্য আমদানিতে এরই মধ্যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করে ক্রিস্টিন ল্যাগার্ড জানান, কিছু খাতে ‘স্পষ্টভাবে’ চীনের অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে বাণিজ্যের কিছু নিয়ম রয়েছে, যা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সদস্যরা অর্থনৈতিক সংস্থাটিতে যোগ দেয়ার সময় সম্মত হয়েছিল। তা সত্ত্বেও বিধিনিষেধ আরোপের ওপর উদ্বেগ রয়েছে এ অর্থনীতিবিদের। সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘শুল্ক বৃদ্ধি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশীয় অর্থনীতির উন্নতি করবে বলে আমাদের ধারণা। কারণ আমাদের একটি বড় বাজার রয়েছে। কিন্তু আমরা ইতিহাস থেকে দেখি এ ধরনের কিছু যে ঘটবে, তা নিশ্চিত নয়।’

অর্থনীতিকে বৈশ্বিকভাবে দেখার আহ্বান জানান ক্রিস্টিন ল্যাগার্ড। তিনি বলেন, ‘আপনি যখন ইতিহাসবিদের দৃষ্টিতে পুরো বিষয়টি দেখেন, তখন স্পষ্টভাবে দেখবেন যে বিশ্বজুড়ে সমৃদ্ধি ও শক্তিশালী নেতৃত্বের সময় বিধিনিষেধ ও বাধা ছিল না।’

এদিকে দিন কয়েক আগে বৈশ্বিক অর্থনীতির সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। সেখানে বাণিজ্যযুদ্ধ ও বিধিনিষেধ বিষয়ে মতামত উঠে এসেছে। এ প্রসঙ্গে আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর গীতা গোপীনাথ বিবিসিকে বলেছেন, ‘শীর্ষ অর্থনীতিগুলোর মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ বিস্তৃত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় আকারে সংকুচিত হতে পারে, যা ফরাসি ও জার্মান অর্থনীতির সম্মিলিত আকারের সমান।’

তিনি জানান, আইএমএফ এখনো সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের বাণিজ্য পরিকল্পনার সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন করতে পারেনি। তবে এটি মনে করে, দেশগুলোর পারস্পরিক নির্ভরতা কমানো ও শুল্ক বৃদ্ধি যদি বিস্তৃতি লাভ করে তবে বৈশ্বিকি জিডিপি ৭ শতাংশের কাছাকাছি ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।

গীতা গোপীনাথ বলেন, ‘৭ শতাংশ অনেক বড় একটি অংশ। আমরা মূলত ফরাসি ও জার্মান অর্থনীতি হারাচ্ছি। এ ক্ষতির আকার হবে দেশ দুটির অর্থনীতির সম্মিলিত আকারের সমান।’

শত শত বিলিয়ন ডলারের এ শুল্ক ‘আমরা গত তিন দশকের মধ্যে যে বিশ্বে বাস করেছি তার থেকে খুব আলাদা’ বলেও মন্তব্য করেন এ আইএমএফ কর্মকর্তা।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত আইএমএফের বার্ষিক সভায় আরেকটি প্রধান বার্তা ছিল বিশ্বব্যাপী সরকারি ঋণের বিস্ফোরক স্তরে পৌঁছে যাওয়ার বিষয়ে সতর্কীকরণ, জানান গীতা গোপীনাথ। তিনি বলেন, স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ‘আপনার আর্থিক ঘাটতির পুরণের মুহূর্ত’ এখন, কারণ ‘এটি শেষ সংকট হবে না। অতিরিক্ত ধাক্কা থাকবে। প্রতিক্রিয়া জানাতে আপনার আর্থিক সংস্থানের প্রয়োজন হবে এবং এখন এটি করার সময়।’

এ ধরনের আশঙ্কার ভেতরও বিশ্ব অর্থনীতি একাধিক সংকট থেকে সহনশীল প্রত্যাবর্তন দেখতে পাচ্ছে বলেও জানান তিনি। এর মধ্যে বেকারত্ব না বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন গীতা গোপীনাথ।

মন্তব্য করুন