১৩ই জুন, ২০২৬

সবজির দাম নাগালের বাইরে কেন?

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সবজির বাজারে অস্থিরতা চলছেই। রাজধানী ঢাকায় বেশির ভাগ সবজির দাম বেড়ে ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে। এতে দিশাহারা নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষ। তাদের প্রশ্ন সবজির দাম কেন এতটা বাড়ছে। দেশের কৃষক, আড়তদার, খুচরা ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এই প্রশ্নের উত্তর মিলেছে। সবজির দাম বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে তারা দেশ জুড়ে অব্যাহত বৃষ্টিপাত, বন্যা ও ব্যবসায়ীদের কারসাজির কথা উল্লেখ করেছেন।

নাটোরের হালসা। এই উপজেলার কৃষক আজিজুর রহমান। চলতি মৌসুমে বেগুন, মরিচ ও মুলার চাষ করেছেন তিনি। কিন্তু অব্যাহত বৃষ্টির কারণে তার উৎপাদিত ফসল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, আমি ৫ বিঘা জমিতে বেগুন চাষ করেছি। অত্যধিক বৃষ্টির কারণে প্রায় ৮০ শতাংশ বেগুন গাছ মারা যায়। এ ছাড়া ৬৫ শতাংশ মরিচ গাছ এবং শতভাগ মুলা গাছ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তিনি বলেন, সবজির দাম বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম কারণ অত্যধিক বৃষ্টিপাত। এদিকে সবজির দাম বাড়লেও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না কৃষকরা। আজিজুর রহমান বলেন, গত সপ্তাহে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ বিক্রি করেছি ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। আর সবচেয়ে ভালো বেগুন বিক্রি করেছি ১০০ টাকা কেজিতে। যদিও ঢাকায় ভালোমানের বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় এবং সোমবার মরিচ বিক্রি হয়েছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়।

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর এলাকার কৃষক হাবিবুর রহমান জানান, অত্যধিক বৃষ্টির কারণে এবার মরিচসহ বেশকিছু সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে গ্রামাঞ্চলেও সবজির দাম বেড়েছে। যদিও সেটা ঢাকার তুলনায় কম। তিনি বলেন, স্থানীয় বাজারে আমরা প্রতি কেজি উস্তে ৪০ টাকা, মুলা ৪৫ টাকা, সবচেয়ে ভালো বেগুন ৮০ টাকা, পটোল ৪০ টাকা, পেঁপে ১৫ থেকে ১৮ টাকা, ঢেঁড়শ ৩৫ টাকা এবং মরিচ ৩০০ টাকায় বিক্রি করতে পারছি। এই এলাকার আরেক কৃষক বাদল মিয়া জানান, তিন বিঘা জমিতে তিনি বেগুন, পটোল ও মরিচ চাষ করেছেন। জমি তৈরি, বীজ, সার, কীটনাশকের জন্য অনেক খরচ হয়েছে। কিন্তু যেই দামে সবজি বিক্রি করি তাতে লাভ তেমন হয় না।

গত সোমবার নাটোর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কৃষকের কাছ থেকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রতি কেজি উস্তে ৪০ টাকা, মুলা ৪৫ টাকা, সবচেয়ে ভালোমানের বেগুন ৮০ টাকা, পটোল ৪০ টাকা, প্রতি কেজি কাঁচকলা ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, বরবটি ৪০ টাকা, পেঁপে ১৫ থেকে ১৮ টাকা, ঢেঁড়শ ৩৫ টাকা, লাউ প্রতি পিস ২৫ থেকে ৩০ টাকা, মরিচ ৩০০, চিচিঙ্গা ৩০ টাকা, ঝিঙ্গা ৩৫-৩৮ টাকায় কিনেছে। এই স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ঢাকার কাওরান বাজারের ফড়িয়া ব্যবসায়ীদের কাছে সবজি বিক্রি করে। সেখানে প্রতিটি সবজির দাম ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ে। এরপর ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা আবার পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে সমপরিমাণ লাভ করে এসব সবজি বিক্রি করে। পরবর্তীতে পাইকারি ব্যবসায়ীরা আবারো একই পরিমাণ লাভ করে খুচরা ব্যবসায়ীদের নিকট পণ্য বিক্রি করে।

গতকাল রাজধানীর খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায়, ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে বেশির ভাগ সবজির দাম। মানভেদে প্রতি কেজি বেগুন ১২০ থেকে ১৫০ টাকা, করলা ১০০ টাকা, কাঁকরোল ১২০ টাকা, পটোল ৯০ থেকে ১০০ টাকা, ঢেঁড়স ১০০ টাকা, বরবটি ১৪০ টাকা, প্রতিটি লাউ ৭০ থেকে ১০০ টাকা, প্রতি কেজি পেঁপে ৪০ থেকে ৫০ টাকা, ধুন্দুল ১৩০ টাকা, চিচিঙ্গা ১০০ টাকা, কচুর লতি ১০০ থেকে ১২০ টাকা, ঝিঙা ১২০ টাকা, শসা ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে প্রতি কেজি মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। যদিও গত সোমবার এই মরিচের দাম ছিল ৬০০ টাকা। অর্থাৎ কৃষকের বিক্রি করা মূল্যের সঙ্গে ঢাকার খুচরা বাজারে পণ্যের মূল্যের ব্যবধান তিন থেকে চার গুণ। কয়েক দফায় হাতবদলের মারপ্যাঁচে সবজির দাম এভাবে বাড়ছে।

এদিকে সবজির দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ টাস্কফোর্স ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বাজার তদারকি টিম বলছে, কাওরান বাজারের ট্রাক থেকে সবজি নামানোর পর ৬ থেকে ৭ বার হাতবদল হয়। প্রত্যেক বার হাতবদলে বাড়ানো হচ্ছে দাম। এর সঙ্গে জড়িত ১২০০ ফড়িয়া ব্যবসায়ী। যাদের কোনো লাইসেন্স নেই। তারা পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের কোনো রশিদ দেয় না। এই সুযোগে আড়তদারদের যোগসাজশে পাইকারি, ব্যাপারী, খুচরা ব্যবসায়ী সবাই মিলেমিশে বাড়াচ্ছে পণ্যের দাম।

এ ছাড়া সবজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ বন্যা। আগস্টে বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় দেশের পূর্বাঞ্চলের ৭টি জেলা। এতে প্লাবিত এলাকায় ফসলি জমি তলিয়ে থাকে ৭ থেকে ২০ দিন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় শীত ও শরৎকালীন সবজি, রোপা আমন ও আউশসহ বিভিন্ন ফসল। অন্যদিকে অক্টোবরের শুরুতেই আকস্মিক বন্যার কবলে পড়ে ময়মনসিংহ অঞ্চল। ময়মনসিংহ, শেরপুর ও নেত্রকোনার ১০ উপজেলা সপ্তাহখানেক পানিতে ডুবে থাকায় নষ্ট হয় প্রায় এক লাখ হেক্টর জমির শস্য। অন্যদিকে এবার সারা দেশে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সিন্ডিকেট বা মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি নয়, বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার প্রভাবও বাজারে পড়েছে। চাহিদা অনুযায়ী জোগান কমে যাওয়ায় সবজির দামে ঊর্ধ্বগতি।

বাজারের অস্থিরতা প্রসঙ্গে বাণিজ্য উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, আমরা স্বীকার করছি যে পণ্যর দাম বেড়েছে। তবে দাম বাড়ার কারণও আছে। চাহিদার তুলনায় পণ্যের সরবরাহ কম। বাজারে বর্তমানে সবজি পণ্যের সরবরাহে বেশ সংকট রয়েছে। কারণ, সবজির উৎপাদন কমেছে। গত কয়েকটি বন্যা ও টানা বৃষ্টিতে অনেক সবজি নষ্ট হয়েছে। এখন উৎপাদন ও সরবরাহ কম থাকলে যতই বাজার তদারকি করা হোক, দাম খুব কমিয়ে আনা যাবে না।

সুলভ মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে ১০টি কৃষিপণ্য: এদিকে মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে সুলভ মূল্যে ১০টি কৃষিপণ্য বিক্রি করছে সরকার। গতকাল বাণিজ্য উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সরকারি উদ্যোগে সুলভ মূল্যে ভোক্তারা এখন ১০টি কৃষিপণ্যও পাবেন। এতে জনগণের সুবিধা হবে। ভোক্তারা যাতে সুলভ মূল্যে সবকিছু পান, এজন্য আমাদের এই প্রচেষ্টা। গতকাল রাজধানীর সচিবালয় এলাকায় খাদ্য ভবনের সামনে কৃষি ওএমএস কর্মসূচির উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন। এই কর্মসূচির আওতায় একজন গ্রাহক ৩০ টাকায় এক কেজি আলু, ১৩০ টাকায় এক ডজন ডিম, ৭০ টাকায় এক কেজি পিয়াজ, ২০ টাকায় ১ কেজি কাঁচা পেঁপে ও পাঁচ কেজি বিভিন্ন ধরনের সবুজ শাকসবজি প্যাকেজ আকারে কিনতে পারবেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে রাজধানীর ২০টি স্থানে ট্রাক সেলের (ট্রাকে করে বিক্রি) মাধ্যমে এসব কৃষিপণ্য বিতরণ করা হবে।

স্থানগুলো হচ্ছে সচিবালয় এলাকার খাদ্য ভবন, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, মিরপুর-১০, বাসাবো, বছিলা, রায়ের বাজার, রাজারবাগ, মুগদা উত্তর, মুগদা দক্ষিণ, পলাশী মোড়, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, গাবতলী, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড, বেগুনবাড়ী, উত্তর খান, দক্ষিণ খান, কামরাঙ্গীরচর, রামপুরা ও জিগাতলা।

মন্তব্য করুন