নদী বাঁচলে বাঁচবে মাছ-জীববৈচিত্র্য, বাঁচবে মানুষের জীবিকা

 

ফটকি নদীসহ বিভিন্ন NbS বাস্তবায়নস্থল পরিদর্শন; জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় নেতৃত্ব ও জনগণের অংশগ্রহণে গুরুত্ব
ফটকি নদী পুনরুদ্ধার ও মাছের অভয়াশ্রম পরিদর্শনে বাস্তব প্রয়োগ দেখলেন সাংবাদিক, মৎস্য কর্মকর্তা, CBO ও যুব প্রতিনিধিরা

মুন্সী হাবিবুল্লাহ (স্টাফ রিপোর্টার ):
মাগুরায় প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান বিষয়ে দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ ।জলাভূমি ও স্বাদুপানির মাছ সংরক্ষণ, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহনশীল জীবিকা গড়ে তুলতে প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান বা Nature-based Solutions (NbS)-এর গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। এরই অংশ হিসেবে মাগুরায় অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান বিষয়ে দুই দিনব্যাপী সক্ষমতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ।

১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মাগুরায় অনুষ্ঠিত এ প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় সাংবাদিক, মৎস্য কর্মকর্তা, কমিউনিটি-বেইজড অর্গানাইজেশন (CBO) এবং যুব সংগঠনের প্রতিনিধিদের NbS সম্পর্কে জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতা বৃদ্ধি করা। বিশেষ করে প্রকৃতি-ভিত্তিক উদ্যোগ কীভাবে বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন, যোগাযোগ ও দীর্ঘমেয়াদে ব্যবস্থাপনা করা যায়—সে বিষয়ে অংশগ্রহণকারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

প্রশিক্ষণের দ্বিতীয় দিনে অংশগ্রহণকারীদের মাগুরার কানুদার খাল, ফটকি নদী ও নবগঙ্গা নদীর নির্বাচিত NbS প্রয়োগস্থল পরিদর্শন করানো হয়। এ সময় তাঁরা মাছের অভয়াশ্রম, নদী-খাল পুনরুদ্ধার কার্যক্রম এবং জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে নেওয়া উদ্যোগ সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন। পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও উপকারভোগীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন অংশগ্রহণকারীরা।

ফটকি নদীর পুনরুদ্ধার কার্যক্রম এ প্রশিক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ ছিল। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৬ কিলোমিটার নদী পুনঃখনন ও পুনর্বাসন করা হয়েছে। এর লক্ষ্য নদীর জলধারণ ক্ষমতা ও জলপ্রবাহ পুনরুদ্ধার করা। স্থানীয়দের অভিজ্ঞতায়, পুনঃখননের পর বিভিন্ন স্থানে পানির প্রবাহ ও জলধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি, বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশনের উন্নতি এবং শুষ্ক মৌসুমে পৃষ্ঠস্থ পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধির মতো পরিবর্তন দেখা গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, বিভিন্ন এলাকায় স্বরপুটি, রয়না, বাছা, পাবদাসহ আগে কমে যাওয়া কিছু দেশীয় মাছের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে এসব তথ্য বর্তমানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পর্যবেক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব নিশ্চিত করতে নিয়মিত ও বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

মাঠপর্যায়ে স্থানীয়রা নদী ও জলজ পরিবেশের বিভিন্ন সংকটের কথাও তুলে ধরেন। তাঁদের অভিযোগ, নদীতে সরাসরি বজ্র ফেলা, নদীর আশপাশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং কচুরিপানার অবাধ বিস্তারের কারণে কোথাও কোথাও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রশিক্ষণে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়—শুধু নদী পুনঃখনন করলেই একটি পূর্ণাঙ্গ প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান নিশ্চিত হয় না। নদীর প্রাকৃতিক সংযোগ পুনরুদ্ধার, মাছের প্রজনন ও আশ্রয়স্থল সংরক্ষণ, নদীতীরে বনায়ন, ক্ষতিকর মাছ ধরার পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ, দূষণ ও দখল রোধ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততার সমন্বয়েই কার্যকর NbS গড়ে তোলা সম্ভব।

দুই দিনের প্রশিক্ষণে জলবায়ু ঝুঁকি, Nature-based Solutions (NbS), Locally Led Adaptation (LLA), NbS-এর ধরন ও প্রয়োগের মানদণ্ড, জলবায়ু ঝুঁকি ও ঝুঁকিপ্রবণতা মূল্যায়ন, ঝুঁকি প্রশমন, শাসনব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, যোগাযোগ, জেন্ডার-সংবেদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক NbS, বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয় বিষয়ে আলোচনা ও ব্যবহারিক অনুশীলন অনুষ্ঠিত হয়।

প্রশিক্ষণে IUCN Global Standard for NbS-এর আলোকে স্থানীয় পর্যায়ে প্রকৃতি-ভিত্তিক উদ্যোগের কার্যকারিতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, অভিযোজনমূলক ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

প্রশিক্ষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল দায়িত্বশীল সংবাদ ও যোগাযোগ। অংশগ্রহণকারী সাংবাদিক ও যোগাযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বলা হয়, কোনো NbS নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির সময় শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাধীন বিশেষজ্ঞ ও বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে উদ্যোগটির সুফল, পরিবর্তন, সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি তুলে ধরা প্রয়োজন।

প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীরা মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে NbS-এর বিভিন্ন মানদণ্ড ও criteria-এর সঙ্গে চলমান উদ্যোগগুলোর সামঞ্জস্য মূল্যায়ন করেন। দলীয় কার্যক্রম ও উপস্থাপনার মাধ্যমে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা, স্থায়িত্ব, অন্তর্ভুক্তি এবং পরিবেশগত সুফল কীভাবে আরও বাড়ানো যায়—তা নিয়েও আলোচনা করা হয়।

প্রশিক্ষণে তিনজন প্রশিক্ষক দায়িত্ব পালন করেন। তাঁরা হলেন Mr. Md. Anisur Rahman, IUCN Consultant; Mr. Md. Tareq Aziz, Programme Officer, IUCN Bangladesh; এবং Ms. Kazi Zenifar Azmiri, Programme Associate, IUCN Bangladesh।

সুইডেন দূতাবাস (SIDA), বাংলাদেশের অর্থায়নে CNRS-এর নেতৃত্বে IUCN, BELA, North South University (NSU), CEDIO ও PRERONA-এর অংশীদারত্বে শ্যামনগর, দাকোপ, কয়রা ও মাগুরায় বাস্তবায়িত হচ্ছে “Biodiversity for Resilient Livelihoods (B4RL) in the Modified Ganges Delta of Bangladesh” প্রকল্প।

আয়োজকদের আশা, এ ধরনের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্থানীয় সাংবাদিক, মৎস্য কর্মকর্তা, CBO ও যুব প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান বিষয়ে জ্ঞান ও মাঠপর্যায়ে তা পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন এবং দায়িত্বশীলভাবে তুলে ধরার সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে ফটকি নদীর মতো স্থানীয় নদী-খাল ও জলাভূমি পুনরুদ্ধার, মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর টেকসই ও সহনশীল জীবিকা নিশ্চিত করতে এসব উদ্যোগ আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

মন্তব্য করুন