বিআইএইচএস জেনারেল হাসপাতালে উত্তেজনা, চিকিৎসক নাসরিন বেগমের বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন
কাজী শরিফ নেওয়াজ লালন
রাজধানীর মিরপুরে বিআইএইচএস জেনারেল হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের পর এক নবজাতকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় রোগীর স্বজন ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পরে পুলিশ ও হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মীদের তৎপরতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। মিরপুর থানার ওসি (অপারেশন) মিজানুর রহমানসহ পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।
রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসক প্রফেসর ডা. নাসরিন বেগমের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন অনন্যা রহমানের সিজারিয়ান অপারেশনের পর নবজাতকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে অনন্যার স্বামী মো. ফজলুর রহমান আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অনন্যা রহমান গর্ভবতী হওয়ার পর প্রায় নয় মাস ধরে ডা. নাসরিন বেগমের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গত ১০ আগস্ট সিজারিয়ান অপারেশন করার কথা ছিল।
ফজলুর রহমানের অভিযোগ, ১০ আগস্ট স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে গেলে ডা. নাসরিন বেগম ওই দিন অপারেশন করতে পারবেন না বলে জানান। পরবর্তী দুই দিনও ব্যস্ততার কারণে অপারেশন করা সম্ভব হবে না বলে তিনি জানান বলে দাবি করেন ফজলুর রহমান।
পরবর্তীতে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত ১৩ আগস্ট তাঁকে বিআইএইচএস জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরিবারের দাবি, এরপর রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় দ্রুত সিজারিয়ান অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ফজলুর রহমানের ভাষ্য, অপারেশন শুরুর পর প্রায় দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও স্ত্রী ও অনাগত সন্তানের অবস্থা সম্পর্কে পরিবারকে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হচ্ছিল না। পরে শিশুর অবস্থা ভালো নয় বলে তাঁদের জানানো হয়। কিছুক্ষণ পর পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়, নবজাতককে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
পরিবারের অভিযোগ, নবজাতকের মৃত্যুর পর চিকিৎসক হাসপাতাল থেকে চলে যান এবং রোগীর পরবর্তী চিকিৎসা ও পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁদের পর্যাপ্ত সহযোগিতা করা হয়নি।
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে রোগীর স্বজন ও স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা হাসপাতাল এলাকায় জড়ো হলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ ও হাসপাতালের আনসার সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক মো. হাসান ঘটনাস্থলে এসে এলাকাবাসীর সামনে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি রোগী অনন্যা রহমানের চিকিৎসা নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তদন্তেই বেরিয়ে আসবে প্রকৃত কারণ
নবজাতকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে রোগীর চিকিৎসা নথি, অপারেশনের কাগজপত্র, ব্যবস্থাপত্র, হাসপাতালের রেকর্ড এবং অপারেশন-সংক্রান্ত তথ্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ফজলুর রহমানের দাবি, নির্ধারিত সময়ে অপারেশন না হওয়া থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে জরুরি অবস্থায় সিজারিয়ান অপারেশন ও নবজাতকের মৃত্যুর পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক।
এ বিষয়ে চিকিৎসক প্রফেসর ডা. নাসরিন বেগমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, রোগী ও শিশুকে বাঁচাতে তাঁর সাধ্য অনুযায়ী যথাযথ চেষ্টা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি এ বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, পরিবারের পক্ষ থেকে মিরপুর মডেল থানায় চিকিৎসক ডা. নাসরিন বেগমের বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে মামলাটি দায়ের হয়েছে কি না, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য সংশ্লিষ্ট থানার কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
মৃত্যুর ঘটনাটি চিকিৎসাজনিত জটিলতা, নাকি চিকিৎসায় অবহেলার কারণে হয়েছে—তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা হোক এবং অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।





