
ফয়সাল হায়দার, স্টাফ রিপোর্টার।
মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলা সদরের গোপালনগর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টির অভ্যন্তরীণ চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক এবং নজিরবিহীন অবহেলার এক বাস্তব দলিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৯৮ সালে এমপিওভুক্ত হওয়া এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে নয়জন শিক্ষক ও দুইজন কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। তাদের বেতনের পেছনে প্রতি মাসে সরকারি রাজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় হচ্ছে প্রায় পৌনে তিন লক্ষ টাকা। অথচ, বিপুল অঙ্কের এই রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের বিপরীতে বিদ্যালয়ে নেই কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার্থী। কাগজের হিসাবের সঙ্গে বাস্তবের উপস্থিতির বিশাল ফারাক এবং সরকারি অর্থের এমন অনুৎপাদনশীল ব্যবহার নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
খাতায় ৩৮ হলেও বাস্তবে আরও কম!
চলতি বছরের জুন মাসের সরকারি স্যালারি শিট অনুযায়ী, বর্তমানে বিদ্যালয়ে কর্মরত ৯ জন শিক্ষক ও ২ জন কর্মচারীর পেছনে সরকারের মোট এমপিওভুক্ত আর্থিক ব্যয় আসে ২,৮৪,৪২১ টাকা। অথচ এই বিশাল বাজেটের বিপরীতে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণী মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানের মূল রেজিস্টার খাতার তথ্য অনুযায়ী মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ৩৮ জন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, কাগজের এই হিসাবের সঙ্গে বাস্তব উপস্থিতির রয়েছে আকাশ-পাতাল ফারাক। নিয়মিত ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতি এই সংখ্যার চেয়েও অনেক কম, যা রাষ্ট্রীয় তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিয়ে বড় প্রশ্ন খাড়া করে। দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে এটি একটি নজিরবিহীন অনুপাত, যেখানে প্রায় প্রতি ৩ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১ জন করে শিক্ষক বা কর্মচারী নিয়োজিত রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৩ জন শিক্ষক ও ৩ জন কর্মচারীর পদ শূন্য রয়েছে। কর্মরত ৯ জন শিক্ষকের মধ্যে ৪ জন সহকারী শিক্ষক সরাসরি এনটিআরসিএ (NTRCA) কর্তৃক সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে যোগদান করেছেন। যোগ্য ও মেধা তালিকায় আসা শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও শুধু শ্রেণিকক্ষের অভাবে এখানে চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম।
সরেজমিনে দেখা যায়, একটি দেয়ালঘেরা জরাজীর্ণ টিনশেড ঘরের ভেতরের ছোট একটি রুমে ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠদান চলছে। শিক্ষকদের জন্য আলাদা কোনো বসার জায়গাও নেই। একই ঘরের এক কোণায় শিক্ষকদের দাপ্তরিক কাজ এবং অন্য কোণায় গাদাগাদি করে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর পাঠদান চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে, বিদ্যালয়ের পূর্বের প্রধান টিনশেড ঘরটি গত বছরের এক ঘূর্ণিঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়ার পর, দীর্ঘ দিন পার হলেও সেটি সংস্কারের অভাবে অবহেলায় পড়ে রয়েছে।
বিদ্যালয়ের সার্বিক অবস্থা বিধি মোতাবেক চলছে দাবি করলেও শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতি কিছুটা কম থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রওশন আরা পারভীন। তবে প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে এখনও আশাবাদী তিনি।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রওশন আরা পারভীন বলেন, বর্তমানে জরাজীর্ণ ঘরেই আমাদের পাঠদান চালাতে হচ্ছে। তবে আমরা যদি বিদ্যালয়ের কাঠামোগত উন্নয়ন করতে পারি এবং এখানে নবম-দশম শ্রেণি সংযুক্ত করা সম্ভব হয়, তবে স্কুলটি আবারও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে এবং ছাত্র-ছাত্রীদের কোলাহলে মুখরিত হবে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, অতীতে একাধিকবার নতুন ভবন এবং অনুদানের জন্য আবেদন করা হলেও রাজনৈতিক নানা জটিলতা এবং অ্যাডহক কমিটির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ফাইলটি লাল ফিতার দূরত্বে আটকে রয়েছে।
বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ স্থবিরতা, নতুন ভবনের আবেদন আটকে থাকা এবং সার্বিক শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনামূলক ইতিবাচক সদিচ্ছার কথা উঠে আসে।
বিদ্যালয়ের বর্তমান সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বেদবতী মিস্ত্রী বলেন:
শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে আমি অত্যন্ত আন্তরিক। মহম্মদপুর উপজেলার প্রতিটা বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ও সার্বিক অবস্থা আমি নিজেই নিয়মিত পরিদর্শন করব। আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আমি গোপালনগর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি সশরীরে পরিদর্শনে যাবো। বিদ্যালয়টির অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং জরাজীর্ণ দশা দূর করতে একটি নতুন ভবন নির্মাণের বিষয়ে আমি জেলা শিক্ষা অফিসার, উপজেলা শিক্ষা অফিসার এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (EED) সাথে জরুরি ভিত্তিতে কথা বলব। এছাড়া, এখানে যাতে দ্রুত নবম-দশম শ্রেণী সংযুক্ত বা অনুমোদন করা যায়, সে ব্যাপারেও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। গোপালনগর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ উপজেলার প্রতিটি বিদ্যালয়কে প্রাণবন্ত ও শিক্ষার্থীবান্ধব করে গড়ে তুলতে প্রশাসন থেকে যা যা করণীয়, তার সবটুকুই করা হবে।
অন্যদিকে, রাজস্বের এই বিপুল ব্যয় ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো: হোসনে মোবারক বলেন:
আমি ইতিমধ্যে গোপালনগর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভবনটি সরজমিনে পরিদর্শন করেছি। স্কুলের অত্যন্ত নাজুক অবকাঠামোগত অবস্থার কারণেই মূলত ছাত্র-ছাত্রীর উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কম। পাশাপাশি এখানে নবম ও দশম শ্রেণির অনুমোদন না থাকায় নতুন শিক্ষার্থীরা এই স্কুলে ভর্তি হতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। তবে সমস্ত জটিলতার অবসান ঘটিয়ে স্কুলে একটি নতুন ভবন নির্মাণের জন্য আমরা ইতিমধ্যেই শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (EED) সাথে কথা বলেছি এবং আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছি। শিক্ষা প্রকৌশলের সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে দ্রুতই এখানে নতুন ভবন নির্মাণ করা হবে। এছাড়া স্কুলে ছাত্র-ছাত্রী কম থাকার বিষয়টি নিয়ে আমরা আবারও স্কুলটি পরিদর্শন করব এবং প্রতিষ্ঠানটি যাতে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ও সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, সেজন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের দিক-নির্দেশনা প্রদান করব।
গোপালনগর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই সামগ্রিক চিত্রটি মহম্মদপুর উপজেলার শিক্ষা প্রশাসনের দীর্ঘদিনের এক বড় দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতাকে প্রকাশ করে। সচেতন মহলে আজ তীব্র প্রশ্ন উঠেছে—জনগণের ট্যাক্সের পৌনে ৩ লক্ষ টাকা প্রতি মাসে ব্যয় করার পরও কেন কোমলমতি শিক্ষার্থীরা শিক্ষার ন্যূনতম পরিবেশ থেকে বঞ্চিত থাকবে?
প্রধান শিক্ষকের আশানুযায়ী এবং প্রশাসনের সদিচ্ছার প্রেক্ষিতে দ্রুত ভবন সংস্কারের ব্যবস্থা করে ও নবম-দশম শ্রেণি চালু করার মাধ্যমে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ানো, অথবা প্রতিষ্ঠানটিকে অন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থার আওতায় এনে সরকারি রাজস্বের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। স্থানীয় শিক্ষা অনুরাগী ও সচেতন মহল অনতিবিলম্বে এই রাষ্ট্রীয় অর্থের সঠিক মূল্যায়ন এবং দ্রুত অবকাঠামোগত রূপান্তরের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জরুরি ও দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।




