শরীয়তপুরে জুলাই শহীদের চাচাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ তকমা দিয়ে থানায় নেওয়ার অভিযোগ, ওসিকে হুমকির ভিডিও ভাইরাল।

 

​আবু বকর সিদ্দিক,
স্টাফ রিপোর্টার:

শরীয়তপুরের নড়িয়ায় নির্বাচনী বিলবোর্ড স্থাপনকে কেন্দ্র করে জুলাই শহীদ মিরাজুল ইসলাম অর্ণবের বাবার সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনায় অর্ণবের চাচাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে থানায় তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় পুলিশ সত্যতা না পাওয়ায় তাকে ছেড়ে দিলে নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রকাশ্যে হুমকি দেন ওই নেতা।

​মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) ওসিকে হুমকির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে জেলাজুড়ে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

​অভিযুক্ত ওই নেতার নাম মতিউর রহমান সাগর। তিনি নড়িয়া উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও ঘড়িষার ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী।

​প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার বিকেলে উপজেলার নোয়াদ্দা বাংলা বাজার এলাকায় নির্বাচনী বিলবোর্ড লাগাতে যান মতিউর রহমান সাগর। এ সময় জমির মালিক ও শহীদ মিরাজুল ইসলাম অর্ণবের বাবা আবু তালেব তাতে বাধা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।

​খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান শহীদ অর্ণবের চাচা আব্দুস সালাম। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় সাগর ও তার লোকজন আব্দুস সালামকে মারধর করেন এবং তাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ ট্যাগ দিয়ে জোরপূর্বক থানায় তুলে নিয়ে যান। সেখানে সাগরের নির্বাচনী ব্যানার ছিঁড়ে ও পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগ এনে আব্দুস সালামকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়।

​তবে পুলিশ বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানালে ক্ষুব্ধ হন বিএনপি নেতা সাগর। একপর্যায়ে তিনি আগের একটি বিস্ফোরক মামলায় আব্দুস সালামকে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে দেখানোর জন্য পুলিশকে চাপ দেন। পুলিশ তাকে ছেড়ে দিলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে নড়িয়া থানার ওসি আনোয়ার হোসেনকে উদ্দেশ্য করে হুমকি দিয়ে বলেন, বাহার (আগের ওসি) গেছে যে পথে, আপনিও যাবেন সে পথে। মঙ্গলবার এই হুমকির ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সব মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

​স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, মতিউর রহমান সাগরের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন সময় সাংবাদিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীরা থানায় অন্তত ছয়টি (০৬) সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

​অভিযোগের বিষয়ে ভুক্তভোগী আব্দুস সালাম বলেন, আমাদের নিজেদের জায়গায় সাইনবোর্ড টাঙানোকে কেন্দ্র করে ভাইয়ের সঙ্গে তাদের বাকবিতণ্ডা ও মারধরের ঘটনা ঘটে। পরে খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে সেখান থেকে চলে আসি। এর কিছুক্ষণ পর আমার বাড়ির সামনে ৮-১০ জন লোক হামলা চালিয়ে আমাকে যুবলীগের ট্যাগ দিয়ে থানায় আটক করার চেষ্টা করে। আমি এই ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা ও এর বিচার দাবি করছি।

​ঘড়িষার ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আল আমিন বলেন, আমার ভাগিনা একজন জুলাই শহীদ। অথচ মতিউর রহমান সাগর তাকে ছাত্রলীগের ট্যাগ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁর এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে দলের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আমি বাংলাবাজার এলাকা থেকে তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করছি এবং দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

​অভিযোগের বিষয়ে জানতে মতিউর রহমান সাগরের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে অন্য এক গণমাধ্যমকর্মীকে তিনি দাবি করেন, ওসির সঙ্গে তাঁর এ ধরনের কোনো কথা হয়নি।

​ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (নড়িয়া সার্কেল) মহিউদ্দিন মিরাজ বলেন, আমাদের কাছে আসা অভিযোগটি যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। হাতাহাতির ঘটনাটি আব্দুস সালামের ভাইয়ের সঙ্গে হওয়ায় আমরা তাকে ছেড়ে দিয়েছি। ওসির হুমকির বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে এমন হয়রানির বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি; তারা যেভাবে নির্দেশনা দেবেন, সে অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

​এ বিষয়ে জেলা বিএনপির সভাপতি ও শরীয়তপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান কিরণ বলেন, এর আগেও তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসন ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে। সে সময় সে দলের কাছে ক্ষমা চেয়েছিল এবং আমরা বিষয়টি কেন্দ্রীয় কমিটিকে জানিয়েছি। একজন কর্মীকে তাৎক্ষণিকভাবে বহিষ্কারের এখতিয়ার আমাদের নেই, তবে পুরো বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের কাছে পাঠানো হবে। তাঁর এ ধরনের উচ্চস্বরে কথা বলা ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। আগামী দুই দিনের মধ্যে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

মন্তব্য করুন