
রিপোর্ট:-এস এম জহিরুল ইসলাম
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। এই নির্বাচনের ফলাফল কেবল একটি ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোতে এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন এবং কণ্টকাকীর্ণ রাজনৈতিক পথ পাড়ি দিয়ে তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় ‘পুরুষ প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে অভিষিক্ত হতে চলেছেন ।
তারেক রহমানের ৬০ বছর বয়সে প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও গবেষণামূলক মহলে ব্যাপক বিশ্লেষণ চলছে। বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৪৬ বছর। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার সময় তার বয়স ছিল ৫২ বছর। পরবর্তীতে নব্বইয়ের দশকে সংসদীয় গণতন্ত্র ফেরার পর বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে প্রথমবার যখন প্রধানমন্ত্রী হন, তখন তার বয়স ছিল ৪৬ বছর।
অন্যদিকে শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তার বয়স ছিল ৪৯ বছর। সে তুলনায় তারেক রহমানের ৬০ বছর বয়সে প্রথমবার সরকার প্রধান হওয়াকে বিশ্লেষকরা দেখছেন এক ‘পরিণত রাজনৈতিক প্রজ্ঞার’ অভিষেক হিসেবে। তারা বলছেন, যেখানে তার পূর্বসূরিরা তুলনামূলক কম বয়সে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসীন হয়েছিলেন, সেখানে তারেক রহমান দীর্ঘ সংগ্রাম, কারাবরণ এবং নির্বাসির জীবনের এক বিশাল অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে ক্ষমতায় আসছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সে সরকার প্রধান হওয়া অত্যন্ত সাধারণ ও ইতিবাচক একটি চর্চা।
আধুনিক গণতন্ত্রের মানদণ্ডে বয়সের চেয়ে অভিজ্ঞতাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন প্রথমবার ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসেন, তখন তার বয়স ছিল ৬৩ বছর। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে জো বাইডেন ৭৮ বছর বয়সে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প ৭০ বছর বয়সে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই ৬০ বছর বয়স আসলে কোনো সীমাবদ্ধতা নয়, বরং একটি অস্থির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্থিতিশীলতা আনার জন্য এটিই সবচেয়ে উপযুক্ত বয়স। তিনি এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিচ্ছেন যখন তার মাঝে তারুণ্যের উদ্ভাবনী শক্তি এবং প্রবীণের দূরদর্শিতা- দুইটি গুণেরই এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। এই বয়স তাকে আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে বিচার-বুদ্ধি দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা দিয়েছে বলে মনে করছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের কাছে তারেক রহমান এখন সবচেয়ে ‘স্মার্ট, তরুণ হৃদয়ের এবং প্রযুক্তি-বান্ধব’ নেতা হিসেবে সমাদৃত। তরুণরা তাকে কেবল একজন নেতা হিসেবে নয়, বরং একজন ‘আইকন’ হিসেবে দেখছে, কারণ তিনি ফাইভ-জি প্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং এর প্রসার এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নিয়ে যে স্বপ্ন দেখান, তা দেশের লাখ লাখ বেকার শিক্ষিত যুবকের মনে আশার আলো জ্বালিয়েছে। তারেক রহমানের পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে তার মার্জিত বাচনভঙ্গি এবং উপস্থাপনা তাকে একজন ‘আধুনিক স্টেটসম্যান’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা সাধারণত বাংলাদেশের গতানুগতিক রাজনীতিতে দেখা যায় না।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার আধুনিক চিন্তাধারা যা বয়সের সীমানাকে জয় করেছে। তিনি যখন কৃষকদের জন্য ‘স্মার্ট এগ্রিকালচার’ বা শিক্ষার্থীদের জন্য ‘শিক্ষা ঋণ’ ও ‘প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের’ কথা বলেন, তখন দেশের তরুণ সমাজ তার মধ্যে নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপিকে একটি এনালগ ঘরানার দল থেকে ডিজিটাল ও আধুনিক সংগঠনে রূপান্তর করার একক কৃতিত্ব তারেক রহমানের। নির্বাচনে জয়লাভের পর তাকে নিয়ে যে উন্মাদনা সৃষ্টি হয়েছে, তার মূলে রয়েছে তার এই স্মার্ট ইমেজ।
তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং নির্বাচনের আগে তার বিরামহীন প্রচারণা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মহাকাব্যিক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। দীর্ঘ সতেরো বছর পর যখন তিনি বাংলার মাটিতে পা রাখলেন, তখন লাখো মানুষের জনস্রোত প্রমাণ করেছিল যে তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের প্রচারণা শুরুর পর থেকে তিনি যেভাবে প্রতিদিন একাধিক জেলায় জনসভা করেছেন এবং বিরামহীনভাবে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে গিয়েছেন, তা ছিল বিস্ময়কর। প্রতিদিন ৪-৫টি বড় জনসভায় বক্তব্য রাখা এবং প্রতিটি সভায় নতুন নতুন উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরা ছিল তার অসামান্য শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। এই বিরামহীন প্রচারণাকে অনেকে ‘তারেক বসন্ত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, কারণ তার প্রতিটি সভায় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ রাজনীতির মাঠের খরা কাটিয়ে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছিল। তিনি কেবল মঞ্চে ভাষণ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং তৃণমূলের সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগের কথা শুনেছেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন, যা সাধারণ ভোটারদের মনে তার প্রতি গভীর আস্থার জন্ম দিয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলছেন, তারেক রহমানের এবারের নির্বাচনি কৌশলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তৃণমূলের সাথে সরাসরি সংযোগ এবং নেতৃত্বের গুণাবলি। তিনি প্রবাসে থাকাকালে যে সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন, দেশে ফেরার পর তাকে পূর্ণ শক্তিতে কার্যকর করেছেন। বিশেষ করে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণে তার কঠোর অথচ নমনীয় অবস্থান এবং যোগ্য ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করার প্রক্রিয়া দলের ভেতরের দীর্ঘদিনের কোন্দল নিমিষেই মিটিয়ে দিয়েছে। তিনি যেভাবে প্রত্যেকটি আসনের প্রার্থী ও স্থানীয় নেতাদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন, তা দলকে একটি ইস্পাতকঠিন ঐক্যে পরিণত করেছিল। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের মতে, তারেক রহমানের এই অক্লান্ত পরিশ্রমই বিএনপিকে একটি বিশাল জয় উপহার দিতে সক্ষম হয়েছে।
তিনি কেবল বড় শহরগুলোতে নয়, বরং প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও তার উন্নয়নের বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। ফ্যামিলি কার্ডের প্রতিশ্রুতি, কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে রোডম্যাপ তিনি প্রতিটি জনসভায় ব্যাখ্যা করেছেন, তা গ্রাম ও শহরের ব্যবধান ঘুচিয়ে ভোটারদের এক সুতায় গেঁথেছিল। এই নেতৃত্বই মূলত তাকে বাংলাদেশের রাজনীতির অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় হলো দীর্ঘদিনের প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের সংস্কৃতি। তবে তারেক রহমান এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এক নতুন ও সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনীতির ডাক দিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। নির্বাচনের ময়দানে প্রতিপক্ষের সাথে লড়াই থাকলেও, ব্যক্তিগত পর্যায়ে তিনি যেভাবে সৌজন্যবোধ দেখিয়েছেন, তা এ দেশের রাজনীতিতে বিরল।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক পরিপক্কতা সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠেছে নির্বাচনের পর তার প্রথম সংবাদ সম্মেলনে। তিনি সেখানে অত্যন্ত বলিষ্ঠ কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, “নির্বাচনে একে অপরের বিরুদ্ধে কিংবা একদল আরেক দলের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে নির্বাচনের মাঠে হয়তো কোথাও কোথাও নিজেদের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। এ ধরনের বিরোধ যেন প্রতিশোধ প্রতিহিংসায় রূপ না নেয়, সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাই।”
বিশাল বিজয়ের পর সাধারণত রাজনৈতিক দলগুলো রাজপথে আনন্দ মিছিল, স্লোগান এবং বাদ্যযন্ত্রের তালে উৎসবে মেতে ওঠে। কিন্তু তারেক রহমান এখানেও এক ভিন্নতর ও গভীর জীবনবোধের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পরও কোনো ধরনের আনন্দ মিছিল না করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর পরিবর্তে তিনি সারা দেশে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায়ের জন্য দোয়া মাহফিলের আহ্বান জানিয়েছেন।
তারেক রহমানের এই পরিমিতিবোধ ও দূরদর্শী নেতৃত্বই বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রে পরিণত করবে বলে মনে করছেন দেশের বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সুধী সমাজ।