মোঃ নাজিম উদ্দিন
গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি
ইট-পাথর আর কংক্রিটের যান্ত্রিক নগরে মানুষের বিস্তার বেড়েছে বহুগুণ। মানুষের তৈরি এই পরিবেশে মানিয়ে নিতে না পেরে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক প্রজাতির পাখি। একসময় ঘরের চাল, বাড়ির উঠান, গাছের ডাল কিংবা জানালার গ্রিলে হরহামেশাই দেখা মিলত দুয়েল, টিয়া, ভাতশালিক, বুলবুলি, টুনটুনি, চড়ুই ও ঘুঘুর। অথচ এখন মাসের পর মাস দেখা মেলে না এসব পাখির। আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে তাদের চেনা আবাসস্থল, কমে আসছে পাখির কলকাকলিও। দেখা মেলে না আগের মতো বাবুইপাখির দৃষ্টিনন্দন বাসা কিংবা কাঠঠোকরার আনাগোনা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বাসযোগ্য শহরের অন্তত ২৫ শতাংশ এলাকা বৃক্ষাচ্ছাদিত থাকা প্রয়োজন। অথচ গাজীপুরে বৃক্ষাচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ মাত্র ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ। শিল্পায়নের প্রভাবে প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে পরিবেশ। পরিবর্তন হচ্ছে জলবায়ু, ভারসাম্য হারাচ্ছে প্রকৃতি। সংকুচিত হচ্ছে পাখিদের আবাসস্থল। একদিকে বৃক্ষনিধন, অন্যদিকে পরিবেশের বিরূপ পরিবর্তন—সব মিলিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে নানা প্রজাতির পাখি।
জানা যায়, প্রায় ৩৩০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় পর্যাপ্ত উন্মুক্ত পার্ক ও উদ্যানের অভাব রয়েছে। নগরায়ণ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে প্রতিবছরই কাটা পড়ছে অসংখ্য গাছ। ফলে আবাসস্থল হারিয়ে পাখিরা হয়ে পড়ছে আশ্রয়হীন। এমন পরিস্থিতিতে গাজীপুরের ভাওয়াল রাজবাড়ী চত্বর যেন পাখিদের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় এক দশক ধরে ভাওয়াল রাজবাড়ী চত্বরের আট শতাধিক গাছকে ঘিরে গড়ে উঠেছে পাখিদের অভয়াশ্রম। আম, মেহগনি ও কাঁঠালগাছসহ বিভিন্ন গাছে নিজেদের উদ্যোগেই বাসা বেঁধেছে নানা প্রজাতির পাখি। শহরের ব্যস্ততা ও কোলাহল পেরিয়ে গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও আশপাশের এলাকায় দলবেঁধে বসবাস করছে চড়ুই, বাবুই, শালিকসহ বিভিন্ন পাখি।
সরেজমিনে দেখা যায়, শেষ বিকেলে সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে গাজীপুর মহানগরীর রাজবাড়ী মাঠ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও আশপাশের এলাকা। নানা প্রজাতির পাখির সম্মিলিত কিচিরমিচিরে সৃষ্টি হয় এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। পাখিদের এই দৃশ্য ও সুরে মুগ্ধ হন আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। ব্যস্ত নগরের বুকেই যেন প্রকৃতি ফিরে পায় তার চিরচেনা রূপ। মনে হয়, গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় শুধু মানুষের প্রশাসনিক কেন্দ্র নয়, হাজারো পাখিরও এক নিরাপদ ঠিকানা।
রাজবাড়ী মাঠে ঘুরতে আসা ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) শিক্ষার্থী ফাহিম ও নাহিদ বলেন, পাখি মানুষের নিঃস্বার্থ বন্ধু। পাখি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়ায় না, পরিবেশ ও অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারা ধান ও অন্যান্য ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষকের উপকার করে। পাশাপাশি বীজ ছড়িয়ে বনাঞ্চল সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখে। তাই পাখির আবাসস্থল সংরক্ষণ ও পাখি সুরক্ষায় সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
এ বিষয়ে গাজীপুর জাতীয় রেঞ্জের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ কর্মকর্তা এম ডি আরিফুল ইসলাম বলেন, শিগগিরই তাঁরা স্থানটি পরিদর্শন করবেন। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে পরিবেশ ও পাখিদের উপযোগী কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।





